যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক হামলা চালালেও কয়েক মাস পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো খাদ্য ও জ্বালানি মজুত রয়েছে ইরানের হাতে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাম্প্রতিক কয়েকটি গোপন মূল্যায়নে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। ফলে অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযান শুরু করলেই যে দেশটিকে দ্রুত নতি স্বীকারে বাধ্য করা যাবে, তা নিশ্চিত নয়।
এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ও ক্রমাগত বাড়ছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ যুদ্ধে ওয়াশিংটনের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের পর্যালোচনা করা একটি নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত কয়েক সপ্তাহেই যুদ্ধের ব্যয় বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
নথি অনুযায়ী, আট মাস আগে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে মার্কিন বাহিনী। এ ছাড়া যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এসব স্থাপনার কয়েকটি ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এ হিসাব তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ বিস্তারিত মূল্যায়ন। এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে অন্তত ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে পেন্টাগনকে বাজেটের বিভিন্ন খাত থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিতে হয়েছে। সংঘাতের শুরু থেকে বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পাশাপাশি সেগুলো সেখানে কয়েক মাস ধরে মোতায়েন রাখতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সামরিক অভিযান পরিচালনা ও অব্যাহত রাখতে মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। স্থলবাহিনীর ব্যয় ২ বিলিয়ন ডলার এবং নৌবাহিনীর ব্যয় ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটির জনপ্রিয়তা কমেছে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে এসেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সংঘাতের অবসান হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার প্রশাসন এমন কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পারেনি, যার শর্তগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূল বলে মনে করছেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে ইরান। বিনিময়ে দেশটির বন্দরগুলোতে আরোপ করা নৌ অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতিতে চাপ আরও বেড়েছে।
তবে সমঝোতার শুরুতে কোন পক্ষ কী ধরনের ছাড় দেবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ওই কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার শুরুতেই ইরানকে কয়েকটি বিষয়ে ছাড় দিতে বলছে ওয়াশিংটন। এসব দাবির মধ্যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিও রয়েছে। তবে তেহরান এ দাবিতে রাজি নয়। সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা নিয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই কূটনীতিক নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
যুদ্ধ ও নৌ অবরোধের কারণে ইরান অর্থনৈতিক সংকটে পড়লেও দেশটির খাদ্য ও জ্বালানির মজুত কয়েক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো রয়েছে বলে সিআইএর মূল্যায়নে বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে মার্কিন অভিযান শুরু হলে এই মজুতের কারণে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব সামাল দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে তেহরান। গোয়েন্দা মূল্যায়নের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় ওই কর্মকর্তার নামও প্রকাশ করা হয়নি।
সিআইএর মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তিন ধরনের কৌশল নিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ, বিশ্বজুড়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে সহিংস হামলার চেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থাপনা ও সম্পদকে লক্ষ্য করে সাইবার অভিযান চালানো।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন করে বাধা সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে মূল্যায়নে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কাও সংঘাতের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধের মধ্যেও ইরানের হাতে কয়েক মাসের খাদ্য ও জ্বালানি মজুত থাকায় নতুন করে সামরিক অভিযান চালালে দ্রুত ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতা এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
মতামত