ঢাকা    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের মাইনের আঘাতে দুই ট্যাংকারে আগুন

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের মাইনের আঘাতে দুই ট্যাংকারে আগুন

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরানের পেতে রাখা নৌমাইনে আঘাত লেগে দুটি তেলবাহী সুপার ট্যাংকারে আগুন ধরে গেছে বলে দাবি করেছে দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। শনিবার (১৭ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায় ইরানের সামরিক বাহিনীর এই অভিজাত ইউনিট। আইআরজিসির দাবি, ট্যাংকার দুটি ইরানের অনুমোদনহীন সামুদ্রিক এলাকা দিয়ে চলাচল করছিল। এ সময় সেগুলো নৌমাইনের সংস্পর্শে আসে। তবে পশ্চিমা ও আরব দেশগুলোর অভিযোগ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে ইরানি বাহিনী সরাসরি বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। বিপ্লবী গার্ডের বিবৃতিতে বলা হয়, দ্বিতীয় ট্যাংকারটিতে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। জাহাজটি নেভিগেশন ব্যবস্থা ও রাডার বন্ধ রেখে অনুমোদনহীন পথে চলার চেষ্টা করছিল। এ সময় মাইনের আঘাতে এর ইঞ্জিনকক্ষে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ট্যাংকারটি তখন দাউ দাউ করে জ্বলছিল বলে দাবি করেছে আইআরজিসি। এর আগে শুক্রবার দুটি ট্যাংকারে হামলার খবর জানিয়েছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড। শনিবার সকালে একটি সুপার ট্যাংকারে আগুন লাগার কথা জানানো হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর দ্বিতীয় ট্যাংকারটিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দেয় বাহিনীটি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় তেহরান। পরে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কার্যত আরও জটিল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলো থেকে তেল নিয়ে কয়েকটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে গত কয়েক দিন ধরে সেখানে জাহাজ চলাচলে আবারও বাধা সৃষ্টি করছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড।

ইয়েমেনে হুতিবিরোধী অভিযান কি মুখ থুবড়ে পড়ছে?

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী হুতিদের দখলে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারে ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান চালাচ্ছে। তবে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ দখল এবং সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এ অভিযানকে কঠিন করে তুলেছে। সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ আল-মাশিকের কাছে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। হামলার সময় ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি প্রাসাদে উপস্থিত থাকলেও তিনি অক্ষত ছিলেন। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তাদের অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটি সামরিক সদর দফতর। সৌদি আরব-সমর্থিত যোদ্ধা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সহায়তাকারী সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তায়েজের আশপাশে তাদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সরকারপন্থী বাহিনীর সরবরাহব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হুতিদের কাছ থেকে ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারই সরকারের ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় অভিযানের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারপন্থী যৌথ বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল ওয়াদাহ আল-দুবাইশ আল-জাজিরাকে বলেন, হুতিরা নিয়মিতভাবে সরকারি বাহিনীর সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। তবে এতে সরবরাহ বন্ধ হয়নি, ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও চলবে। তিনি বলেন, হামলার কারণে কোনও কোনও ফ্রন্টে সরঞ্জাম পৌঁছাতে দেরি হতে পারে কিংবা ব্যয় বাড়তে পারে। কিন্তু আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথ এখনও ব্যবহারযোগ্য থাকায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তায়েজ কার্যত অবরুদ্ধ সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তায়েজ শহরে। হুতিরা শহরটির সঙ্গে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এডেনের প্রধান সড়কটি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। পার্বত্য এলাকার বিকল্প পথগুলোও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক হুতি অগ্রযাত্রার পর তায়েজে জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে সেখানে পেট্রলের দাম তিন গুণ বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ হারানোয় সরকারি বাহিনীর কাছে গোলাবারুদ, অতিরিক্ত সেনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দর দখল করে হুতিরা। পশ্চিম তায়েজ অঞ্চলে সরকারপন্থী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র ছিল বন্দরটি। পরে পাল্টা অভিযানে কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে পারলেও মোখার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি সরকারি বাহিনী। ইয়েমেনের উপপ্রতিমন্ত্রী ফয়সাল আল-মাজিদি বলেন, বিচ্ছিন্ন ফ্রন্টগুলোর মধ্যে সরবরাহ সচল রাখতে সরকারপন্থী বাহিনী বিকেন্দ্রীকরণ ও বিকল্প রুট ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে। শাবওয়া, মারিব, তায়েজের হুতিমুক্ত এলাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে কেন্দ্র করে সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সুরক্ষিত রাখতে কৌশলগত উঁচু এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সৌদি সহায়তা ও সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান শুরুর পর ইয়েমেনের সরকার ও মিত্র বাহিনীর প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন বেড়েছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার বিষয়টিও স্বীকার করেছে রিয়াদ। আল-দুবাইশের মতে, ইরানের সরবরাহ করা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ উন্নত সামরিক সক্ষমতা এবং বিপুলসংখ্যক যোদ্ধার কারণে হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, অক্টোবরের শুরু থেকে চালানো বিমান হামলায় হুতিদের শত শত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অভিযান সফল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সরকারপন্থী বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা। ভিন্ন ভিন্ন কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত এসব বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো যায়নি বলে মনে করা হচ্ছে। জানুয়ারিতে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল সব হুতিবিরোধী সামরিক ইউনিটকে একক কমান্ডের আওতায় আনতে সুপ্রিম মিলিটারি কমিটি (এসএমসি) গঠন করে। তবে বাহিনীগুলোর অর্থায়ন ও নেতৃত্ব কাঠামোয় দীর্ঘদিনের পার্থক্য এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। ইয়েমেনের সামরিকবিষয়ক গবেষক আদনান আল-জাবারনি অবশ্য মনে করেন, বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ছে। তার মতে, হুতিরা সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারকে চাপে ফেলতে বেসামরিক স্থাপনা ও সরবরাহপথে হামলা চালালেও এতে হুতিবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হতে পারে। তবে তায়েজের অবরোধ ভাঙা, সরবরাহপথ পুনরুদ্ধার এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সরকারপন্থী বাহিনীর অগ্রযাত্রা ধরে রাখা কঠিন হবে। ফলে সৌদি সহায়তার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ই ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের সাফল্যের প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

ইয়েমেনে হুতিবিরোধী অভিযান কি মুখ থুবড়ে পড়ছে?

তেহরান ওয়াশিংটনের জন্য সংঘাতের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে: ইরানি সম্পাদক

তেহরান ইচ্ছাকৃতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক কৌশলগত পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা ওয়াশিংটনের জন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।  ইরানের ‘আল-ভেফাগ’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোখতার হাদ্দাদ এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, তেহরানের সামরিক মতবাদ এখন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজের ওপর পূর্বনির্ধারিত আক্রমণ চালানোর দিকে মোড় নিয়েছে। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাদ্দাদ বলেন, বর্তমান সংঘাতটি এখন “ইচ্ছাশক্তির লড়াইয়ে” রূপ নিয়েছে। এই লড়াইয়ে তেহরান ওয়াশিংটনের জন্য সংঘাতের চড়া মূল্য নির্ধারণ করতে এবং জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণের মার্কিন প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতে সফল হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো শর্তের কাছে তেহরান আত্মসমর্পণ করবে না এবং চলমান আলোচনায় কোনো ধরনের ছাড়ও দেবে না। সূত্র: আল-জাজিরা

তেহরান ওয়াশিংটনের জন্য সংঘাতের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে: ইরানি সম্পাদক

যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইরানে ‘মাদার অব অল বম্বস’ ফেলবে, ফেললে কী হবে

ইরানের পরমাণু কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় নিজেদের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা দিয়ে হামলার ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মাটির গভীরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসে এই বোমার কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ট্রাম্প প্রশাসনেই সংশয় রয়েছে। এমন হামলার জবাবে ইরানই–বা কী করতে পারে, তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি আবার সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন, তবে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক প্রকল্পগুলোয় নিজেদের অস্ত্রাগারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা দিয়ে হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা স্তিমিত থাকার এ সময়ে ‘মাদার অব অল বম্বস’ (শাব্দিক অর্থে ‘সব বোমার মা’) নামে পরিচিত ‘জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি)’ বোমার ব্যবহার চলমান সংঘাতকে অনেক বড় আকারে উসকে দিতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামরিক পরিকল্পনা–সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তারা সিএনএন ও আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জনে এ বোমার ব্যবহার সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ভিত্তিক সামরিক বিশেষজ্ঞ এলিজাহ ম্যাগনিয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, এ বোমা ব্যবহারেও ইরানের মাটির গভীরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে এমন হামলা একধরনের ‘রাজনৈতিক নাটক’ মঞ্চস্থ করা ছাড়া আর কিছুই হবে না। কী এই ‘এমওএবি’ বোমা এমওএবি হলো সাড়ে ৮ হাজার কেজি (১৮ হাজার পাউন্ড বা সাড়ে ৮ টন) উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক–সমৃদ্ধ এক বড় মারণাস্ত্র। ৯ হাজার ৮০০ কেজি (২১ হাজার ৬০৫ পাউন্ড বা প্রায় ১০ টন) ওজনের এ বোমা সাধারণ চারটি প্রাইভেট কারের সমান ভারী এবং এর দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের কিছু বেশি (প্রায় ৩০ ফুট), যা একটি ছোট ইয়টের আকৃতির সঙ্গে তুলনীয়। আকারে অত্যন্ত বড় হওয়ায় কোনো স্টিলথ বোমারু বিমানে এ বোমা ধরে না। ফলে সাধারণত লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস কার্গো বা মালবাহী বিমান থেকে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়। ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে প্রথম তৈরি হওয়া এ বোমার এ পর্যন্ত ১২ বার বিস্ফোরণ পরীক্ষা চালানো হয়েছে। বোমাটির এ নামকরণের পেছনে একটি ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ‘মাদার অব অল ব্যাটেলস’ বা ‘সব যুদ্ধের মা’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। মূলত তাঁর সেই মন্তব্যের অনুকরণ করেই এ বোমার নাম রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আগে মাত্র একবারই এ বোমা ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে ‘ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স’–এর (আইএসকেপি) গুহা ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল। সে সময় আফগান কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, হামলায় আইএসের ৯৪ জন যোদ্ধা নিহত হন। তবে স্থানীয় কিছু অসমর্থিত সূত্রে বেসামরিক লোকজনের হতাহত এবং বহু বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। কেমন ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে এ বোমা মাটি থেকে মাত্র কয়েক ফুট ওপরে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই এমওএবি বোমা। ফলে বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে এটি চারদিকে আগুনের মারাত্মক মরণঘাতী তরঙ্গ ছড়িয়ে দেয় এবং যেকোনো ভবন, গুহার মুখ ও শক্ত পৃষ্ঠের অন্যান্য স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে পারে। সামরিক বিশেষজ্ঞ এলিজাহ ম্যাগনিয়ারের মতে, একটি নির্দিষ্ট ভূপৃষ্ঠের বিশাল এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরণ ঘটানোই এ বোমার মূল উদ্দেশ্য। আরেক সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল নিদাল আবু জাইদ আল-জাজিরাকে জানান, এ বোমা বিস্ফোরণের জন্য মাটিতে আঘাত করার প্রয়োজন হয় না। এর তীব্র বিস্ফোরণ তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠের ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের (দশমিক ৬ মাইল) মধ্যের সবকিছু ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। নিদাল আবু জাইদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হতে পারে, এ উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানের স্থলবাহিনীর অবস্থানগুলো ধূলিসাৎ করে দেওয়া। একই সঙ্গে ট্রাম্প আগে যে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, সেখানকার ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোয় আঘাত হানার উদ্দেশ্যও যুক্তরাষ্ট্রের থাকতে পারে। অবশ্য বিশেষজ্ঞ এলিজাহ ম্যাগনিয়ার মনে করেন, এ বোমার ধ্বংসক্ষমতা ও বিস্তৃতি কোন ধরনের ভূপ্রকৃতি বা কতটা জনবহুল এলাকায় এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। মাটির অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকা লক্ষ্যের বিরুদ্ধে এটি খুব একটা কার্যকর না–ও হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের যেসব পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাতে চায়, তার মধ্যে ফোরদো প্রকল্প ও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে নির্মাণাধীন একটি স্থাপনা রয়েছে। এগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত। এলিজাহ বলেন, এ বোমার বিশাল বিস্ফোরক অংশটি উন্মুক্ত স্থানে থাকা সেনাদল, সামরিক সরঞ্জাম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ওপর মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। আফগানিস্তানের অভিযানটি মূলত গুহা ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে এ বোমার কার্যকারিতা প্রমাণ করে; তবে সব ধরনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করার সক্ষমতা এর আছে কি না, তা নিশ্চিত করে না। এমওএবির বিস্ফোরণ মাটির নিচে পৌঁছাতে পারলেও, পাহাড়ি শিলা বা গভীর কংক্রিট ভেদ করার জন্য বোমাটি বিশেষভাবে তৈরি নয়, যা সাধারণত ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা করে থাকে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার বাস্টার হলো, জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর। ১৩ হাজার ৬০০ কেজির (৩০ হাজার পাউন্ড বা প্রায় সাড়ে ১৩ টন) এ নিখুঁত নিশানাযোগ্য বোমা তৈরিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিস্ফোরণের আগে মাটির প্রায় ২০০ ফুট (৬১ মিটার) গভীর পর্যন্ত ভেদ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই এ বোমা ব্যবহার করবে আগেই বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে এ বোমার ব্যবহার করেছে। তবে এলিজাহ ম্যাগনিয়ার বলেন, ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যে সফলভাবে আঘাত হানার অনিশ্চয়তা ছাড়াও ইরানের যেসব অঞ্চলে পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে, সেখানে এ বোমা বহনের উপযোগী বিমান মোতায়েন করা বেশ কঠিন হতে পারে। কারণ, ওই ধরনের ভৌগোলিক পরিবেশের জন্য উপযোগী স্টিলথ বোমারু বিমানগুলো এত বড় আকৃতির বোমা বহন করতে পারে না। এ সামরিক বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বোমাটি ব্যবহার করে অবকাঠামো ধ্বংস করা হলেও ইরানকে কোনো ছাড় দিতে বাধ্য করা না–ও যেতে পারে। তাঁর মতে, বোমাটি ব্যবহার করলে এমন একটি ‘দৃষ্টিনন্দন ঘটনা’ ঘটতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিকভাবে খুব সামান্য ফলই বয়ে আনবে। এলিজাহ ম্যাগনিয়ার বলেন, ‘এ বোমা ব্যবহারের পক্ষে সওয়াল করা যেকোনো কমান্ডারের কাছে আমার প্রশ্ন হবে অত্যন্ত সহজ—অস্ত্রটি এমন কী অর্জন করবে, যা অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে সম্ভব নয় এবং এ বোমা ব্যবহারের ফলাফল কীভাবে একটি রাজনৈতিক সমঝোতাকে এগিয়ে নেবে?’ এলিজাহ ম্যাগনিয়ার আরও বলেন, ‘যদি উত্তরটি শুধু বিস্ফোরণের ‘‘নাটকীয় দৃশ্যের’’ ওপরই কেন্দ্র করে হয়, তবে এ প্রস্তাব সামরিক কৌশলের চেয়ে রাজনৈতিক নাটকের জন্যই বেশি উপযুক্ত।’ এদিকে সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্প ব্যক্তিগত আলোচনাগুলোয় চলমান যুদ্ধের একটি ‘চূড়ান্ত’ সমাপ্তি খুঁজছেন, যেটি প্রমাণ করবে, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত অপরাজিতই রয়ে গেছে। ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এমওএবি বোমা দিয়ে হামলা চালানো হলে ইরানের পক্ষ থেকে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, এর জবাবে তেহরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, এমন প্রতিবেশী দেশগুলোও আক্রমণ করতে পারে। ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা অবশ্য বেশ কয়েক মাস ধরেই কুয়েতের মতো দেশগুলোয় সম্ভাব্য অভিযানের বিষয়ে মন্তব্য করে আসছেন। এর মূল লক্ষ্য হবে মার্কিন সেনাদের বন্দী করে ওয়াশিংটনকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। এর আগে গত মে মাসে সংঘাত সাময়িকভাবে থামার সময় কুয়েত অভিযোগ করেছিল, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ সেনারা তাদের বুবিয়ান দ্বীপে অনুপ্রবেশ করেছেন। সে সময় ইরানি ও কুয়েতি বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় এক কুয়েতি নাগরিক আহত ও ইরানের চার সেনাকে বন্দী করা হয়। অবশ্য ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, নৌ সেনাদের নেভিগেশন বা দিকনির্ণয় ব্যবস্থা বিকল হয়ে যাওয়ার ফলেই এ ঘটনা ঘটেছিল। এদিকে গত মঙ্গলবার আইআরজিসির নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাগদি সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি স্থলপথে কোনো হামলা চালায়, তবে ইরান বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনাকে বন্দী করতে পারে। যদিও ইরানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সামরিক বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের স্থল অভিযানের হুমকিকে বরাবরই নাকচ করে এসেছেন। রেজা নাগদি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল হামলা শুরু করে, তবে তাদের এত সেনা বন্দী হবে যে তারা শেষ পর্যন্ত সাদা পতাকা ওড়াতে (আত্মসমর্পণ করতে) বাধ্য হবে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান অস্ত্রের মজুত বাড়িয়ে, গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা কেন্দ্রগুলো আরও সুরক্ষিত করে এবং মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে পরবর্তী দফা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত রোববার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই হুমকি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা যদি আবারও শুরু হয়, তবে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ এই অঞ্চলের ডিজিটাল অবকাঠামোগুলোয় আঘাত হানবে। এর মধ্যে যোগাযোগ কেবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত স্থাপনা মূল নিশানা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইরানে ‘মাদার অব অল বম্বস’ ফেলবে, ফেললে কী হবে

ইরানের নিখুঁত হামলায় ভীষণ চাপে যুক্তরাষ্ট্র: রয়টার্স

উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক নিখুঁত হামলা চালিয়েছে ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।  এসব হামলায় তেল রফতানি, গ্যাস উৎপাদন, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানিশোধন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলও জটিল হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত সাতটি দেশে ৮৪টি অবকাঠামোগত স্থাপনায় কমপক্ষে ১৩৫টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলাগুলোর অনেকগুলোই ছিল নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো। এতে কিছু ক্ষেত্রে পুরো স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, আর কোথাও দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তেল ও গ্যাস স্থাপনায় বড় ক্ষতি ইরানের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর। হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত এই বন্দরটি ইরানের অবরোধ এড়িয়ে তেল রফতানির গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বন্দরটিতে অন্তত ১৯ বার হামলা হয়েছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। হামলায় তেল স্থানান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মে মাসের একটি ড্রোন হামলার পর পরিশোধিত জ্বালানি রফতানি প্রায় এক মাস বন্ধ ছিল। পরে কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হলেও বারবার হামলায় বন্দরটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। এতে গ্যাস তরল করার কাজে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শীতলীকরণ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতারএনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবির মতে, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রফতানির এই বিকল্প পথে সেপ্টেম্বরের এক হামলার পর অপরিশোধিত তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়ে। বিমানবন্দর, ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও লক্ষ্যবস্তু হামলা শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। কুয়েতের বিমানবন্দরে আটবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনের একটি স্থাপনায় হামলার ছয় মাস পরও সেবা পুরোপুরি চালু করা যায়নি বলে রয়টার্স জানিয়েছে। আবুধাবির এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়ামের আল তাওয়েলা কারখানায় হামলায় ১ হাজার ২৬২টি অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শেষ নাগাদ সেগুলোর মাত্র এক-চতুর্থাংশ চালু করা সম্ভব হয়েছিল। স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে। কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানিশোধন স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে। মরুভূমিপ্রধান দেশটি পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার স্থাপনাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে দেশটির আটটি যৌথ বিদ্যুৎ ও পানিশোধন স্থাপনার অন্তত চারটিতে হামলা হয়েছে। সৌদি আরবের তেল উৎপাদনে ধাক্কা সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের পাঁচটি এবং তিনটি বড় তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসের বেশির ভাগ সময় দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে ছিল। যুদ্ধের আগে উৎপাদন ছিল দৈনিক এক কোটির বেশি ব্যারেল। এতে বর্তমান দরে সৌদি আরবের ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব হারানোর হিসাব দিয়েছে রয়টার্স। দেশটির জাজান শোধনাগারেও জুলাইয়ের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত অন্তত চারবার হামলা হয়। হামলার পর শোধনাগারটির উৎপাদন শূন্যে নেমে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের নিখুঁত লক্ষ্যভেদ নিয়ে উদ্বেগ রয়টার্স ৩৬ জনের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট চিত্র, ভিডিও এবং সরকারি বিবৃতি বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানটি তৈরি করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর শিল্পবিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ১৪ জনের মূল্যায়ন ছিল, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতি কেবল আকাশ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়ে হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার অনেক ঘটনায় দাবি করেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূপাতিত ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি দেশে হামলার পরের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংবেদনশীল স্থাপনার নকশা ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা ধারণা করছেন। রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও মার্কিন কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন; তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। এই ধারাবাহিক হামলা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ফলে সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে, তা নতুন করে সামনে এসেছে। সূত্র: রয়টার্স

ইরানের নিখুঁত হামলায় ভীষণ চাপে যুক্তরাষ্ট্র: রয়টার্স

ইরানের হয়ে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, জার্মানিতে দু’জনের কারাদণ্ড

ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করার দায়ে দুই ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দিয়েছেন জার্মানির একটি আদালত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে তারা জার্মানিতে এসব হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। দণ্ডপ্রাপ্ত দু’জনের একজন ডেনমার্কের নাগরিক আলী এস। তাকে আট বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার সহযোগী আফগানিস্তানের এক নাগরিককে চার বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গুপ্তচরবৃত্তি ও হত্যাচেষ্টার দায়ে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। জার্মানির কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেনমার্কের নাগরিক আলী এস ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের নির্দেশে কাজ করতেন। তবে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এবং ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইরানের কথিত গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এ রায় এল। ইউরোপের একাধিক দেশ অভিযোগ করেছে, তাদের ভূখণ্ডে বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনার পেছনে তেহরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে ইরান অতীতেও এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর আগে চলতি মাসেই যুক্তরাজ্যে দুই ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডের ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ওই ঘটনাও ইউরোপে ইহুদি সম্প্রদায় ও ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জার্মানির এ রায় এমন এক সময়ে এল, যখন ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের কথিত গোয়েন্দা তৎপরতা ও সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং তেহরানের অস্বীকৃতি- দুই বিষয়ই কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

ইরানের হয়ে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, জার্মানিতে দু’জনের কারাদণ্ড

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের হাতে আর কী কী সামরিক বিকল্প আছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক শক্তি পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দুই দেশের সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও সামরিক উত্তেজনা কমার লক্ষণ নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সঙ্গে অচলাবস্থা ভাঙতে ট্রাম্পের হাতে সামরিক বিকল্প কী রয়েছে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের সম্ভাব্য মূল্য কতটা? কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে সামরিক বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে প্রধানত তিনটি পথ রয়েছে- ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও চাপ অব্যাহত রাখা, নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করা এবং সীমিত স্থল অভিযান চালানো। তবে প্রতিটি বিকল্পেরই রয়েছে উল্লেখযোগ্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি। যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে পরবর্তী মাসগুলোতে উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অন্তত ২০ শতাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। পরে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। গত বৃহস্পতিবার দাম ছিল প্রায় ১০৪ ডলার। জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ভেঙে পড়ে। এরপর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চললেও গত মাসে প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। যুক্তরাজ্যের লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা আফজাল আশরাফ আল-জাজিরাকে বলেন, সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের তুলনা চলে না। কিন্তু সেই বিপুল সক্ষমতা কাজে লাগিয়েও ওয়াশিংটন কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি। বিকল্প এক: নৌ অবরোধ ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত এ পথেই এগোনোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে নৌবাহিনীর পাহারা দিতে পারে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। এগুলোতে গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। মার্চে প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই চলাচল ভেঙে পড়ে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় সেপ্টেম্বরে ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহন যুদ্ধপূর্ব মাত্রার ৮১ শতাংশের বেশি হয়েছিল। তবে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর প্রণালি দিয়ে মাত্র ২৯ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা ওই মাসের সর্বনিম্ন। বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক বুরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে টহল ও নজরদারি বাড়িয়ে জাহাজগুলোকে কিছুটা নিরাপত্তা দিতে পারে। ড্রোনের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও হামলা চালানোয় ব্যয় তুলনামূলক কম হচ্ছে। তবে ইরানও কৌশল বদলেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে জাহাজে ১৫টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম খরচে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারছে তেহরান। বিকল্প দুই: নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা বাড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি ট্রাম্প। পরিস্থিতির অবনতি হলে ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও দেশের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত পরিসরে নতুন হামলা চালানো হতে পারে বলে মনে করেন প্যাট্রিক বুরি। তবে আগের হামলার তুলনায় এবার কম ফল পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আফজাল আশরাফের মতে, ইরান অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনলেও সেগুলো আরও ভালোভাবে আড়াল করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে এসেছে। ইরানের তুলনামূলক সস্তা একটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ লাখ ডলার বা তার বেশি দামের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বিরুদ্ধে এক হাজারের বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের মজুত পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে ২০৩০ সালের শেষ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য গোলাবারুদের মজুত আগের পর্যায়ে ফেরাতেও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন প্যাট্রিক বুরি। নতুন হামলা হলে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত মাসে ঘোষণা করেন, ‘সমানুপাতিক জবাবের’ যুগ শেষ হয়েছে। এছাড়া নতুন সংঘাতের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিকল্প তিন: খার্গ দ্বীপে সীমিত স্থল অভিযান ইরানের তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয় খার্গ দ্বীপ দিয়ে। দেশটির উপকূল থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প। সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডপ্রধান জোসেফ ভটেল বলেছেন, ৮০০ থেকে ১ হাজার সেনা দিয়ে দ্বীপটি দখল করা সম্ভব হতে পারে। তবে মূল ভূখণ্ড থেকে ইরানি বাহিনীর হামলার মুখে মার্কিন সেনারা অত্যন্ত ঝুঁকিতে পড়বেন। আশরাফের মতে, ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করতে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে অভিযান শুরু করা সম্ভব। কিন্তু দ্বীপ দখলের পর সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের হামলার ঝুঁকি থাকবে। পাল্টা হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে তেহরান। ইতোমধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে। এ কারণে খার্গ দ্বীপ দখলকে অত্যন্ত অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন আশরাফ। পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনা কম বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা আরও কম। ট্রাম্পও স্থলযুদ্ধের বিষয়টি অনেকটাই নাকচ করেছেন। মার্চে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, লক্ষ্য অর্জনে স্থলসেনার প্রয়োজন হবে না। প্যাট্রিক বুরির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এমন অভিযান চালানো বাস্তবসম্মত নয়। বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি স্থলযুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি ওয়াশিংটনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নির্বাচনের হিসাব ও আঞ্চলিক অস্থিরতা যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রায় ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তুষ্ট। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় নতুন সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক মূল্যও তাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদে শক্তি পুনরুদ্ধার করাও বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও তত বাড়বে। রবিবার ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পরিচালিত জাহাজ চলাচলের উদ্যোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতেই হামলা চালাচ্ছে তেহরান। তার ভাষায়, “আপনারা চোরাচালান করছেন, কিন্তু প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে।” তাই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামরিক চাপ বাড়ানোর একাধিক পথ থাকলেও কোনওটিই সহজ সমাধান দিচ্ছে না। নৌ অবরোধে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে, নতুন হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও চাপে পড়তে পারে, আর স্থল অভিযান ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি ও রাজনৈতিক সংকট। ফলে ট্রাম্পের জন্য সামরিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের হাতে আর কী কী সামরিক বিকল্প আছে?

ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে হরমুজ পেরোনোর চেষ্টা, জাহাজে হামলা চালাল ইরান

বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বাহিনীর দাবি, তাদের হামলার পর নৌযানটিতে আগুন ধরে যায়। সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়া তাদের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির হামলার শিকার ওই জাহাজটি ট্রান্সপন্ডার তথা শনাক্তকরণ সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থা বন্ধ রেখে এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে প্রণালিটি অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে পৃথক চারটি ঘটনায় জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে তেহরান। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের এই অবরোধের জবাবে দেশটির বন্দরগুলোতে পাল্টা অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিয়মিত পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবিও করছে মার্কিন বাহিনী। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজগুলোতে প্রায়ই হামলা চালাচ্ছে তেহরান। আইআরজিসির সংবাদমাধ্যম ‘সেপাহ নিউজে’ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাহিনীটির নৌবাহিনী জানায়, ‘হরমুজ প্রণালিতে একটি সুপারট্যাংকারে আঘাত হানা হয়েছে এবং সেটিতে আগুন ধরে গেছে।’ বিবৃতিতে বলা হয়, সোমবার (১২ অক্টোবর) লক্ষ্যবস্তু হওয়া জাহাজটি নিজের অবস্থান শনাক্ত করার সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থা বন্ধ করে ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এ ছাড়া আইআরজিসির নৌবাহিনীর সতর্কবার্তাও উপেক্ষা করেছিল জাহাজটি। এর আগে গত শনিবার আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার আলি ওজমায়ি সতর্ক করে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় শনাক্ত হওয়া এড়াতে যেসব জাহাজ নিজেদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখবে, সেগুলোকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এসব জাহাজের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও সেসময় হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এদিকে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও সোমবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে পৃথক চারটি ঘটনায় জাহাজে আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে। সূত্র: আল-আরাবিয়া বিডি প্রতিদিন/এনইউ

ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে হরমুজ পেরোনোর চেষ্টা, জাহাজে হামলা চালাল ইরান

ইরানকে সহায়তা করলে চীন-রাশিয়ার অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে: ট্রাম্প

ইরানকে চীন বা রাশিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করছে বলে বিশ্বাস করেন না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মতে, তেহরানকে সহযোগিতা করতে গেলে মস্কো ও বেইজিংকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। সোমবার গভীর রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সমালোচক ও বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, চীন ও রাশিয়া ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নন তিনি। ট্রাম্প বলেন, চীন ও রাশিয়া যদি ইরানকে সহায়তা করেও থাকে, তবে তা খুবই সামান্য। তবে এমন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তার যুক্তি, ইরানকে সহযোগিতা করলে দেশ দুটির অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। সত্যিই তারা সহায়তা করলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত তা জানতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই বক্তব্য সামনে এলো। এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, ইরান ইস্যুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছেন। গত মাসে শি চিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় বেইজিং তেহরানকে কোনো সহায়তা করবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে বেইজিং একে ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। এদিকে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীনের সহায়তায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রি করছে ইরান। পাশাপাশি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহারের বিষয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব দাবি আগেও প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। বিডি-প্রতিদিন/শআ

ইরানকে সহায়তা করলে চীন-রাশিয়ার অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে: ট্রাম্প

হরমুজে ইরানের নতুন চাল, বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি রফতানি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আরব দেশগুলোর পরিচালিত একটি বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থাকে সরাসরি নিশানায় নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহযোগিতায় ছোট জাহাজ থেকে বড় তেলবাহী ট্যাংকারে জ্বালানি স্থানান্তরের যে ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেটি এখন তেহরানের লক্ষ্যবস্তু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ায় তেহরানও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে সামরিক ও কূটনৈতিক- দুই পথেই যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার কথা বলছে ইরান। রবিবার রাতে দেওয়া বক্তব্যে রেজাই দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ছোট জাহাজ ব্যবহার করে তেল বড় ট্যাংকারে স্থানান্তর করছে। তার অভিযোগ, কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতেই এই ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজে হামলা চালাচ্ছে ইরান। রেজাই বলেন, “আপনারা চোরাচালান করছেন। কিন্তু প্রণালিটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে, আর আমরাই এটি পরিচালনা করি।” তার এই বক্তব্যকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রফতানি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছানোর দাবি করেছেন ট্রাম্প। ইরানের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, বিকল্প পথে তেল পরিবহন যতই বাড়ুক, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে সরে আসতে রাজি নয় তেহরান। ওমানের উপকূল ঘেঁষে বিকল্প তেল পরিবহন যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর ইরানের পাল্টা হামলায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি চালু রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এতে অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) এবং অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজ সমন্বিতভাবে কাজ করে। আরব দেশগুলোর বন্দর থেকে তেল নিয়ে জাহাজগুলো ওমানের উপকূল ঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। পরে ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হয়। এভাবে বড় ট্যাংকারে তেল তুলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। কিছু ছোট জাহাজ আবার উপসাগরে ফিরে গিয়ে নতুন করে তেল সংগ্রহ করে। হামলার ঝুঁকি কমাতে এসব জাহাজের অনেকগুলো স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণব্যবস্থা বা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে এবং রাতের অন্ধকারে চলাচল করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এতে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা এবং চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। রবিবার রাত থেকে সোমবারের মধ্যে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি ছেড়ে যাওয়া দুটি ট্যাংকার এবং ওমানের বন্দরনগরী সোহারসংলগ্ন নোঙর এলাকায় থাকা আরেকটি জাহাজ রয়েছে। সোহার এলাকায় জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত সপ্তাহেও কয়েকটি জাহাজ লক্ষ্য করে প্রক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। এতে ইঙ্গিত মিলছে, হামলা কেবল হরমুজ প্রণালির ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; বিকল্প দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অবরোধ অব্যাহত থাকলে হামলাও চলবে ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখলে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলও নিরাপদ থাকবে না। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর তেল রফতানির প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে তেহরান আরও সক্রিয় হয়েছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম ভাগেই অন্তত ১৫টি জাহাজ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উইন্ডওয়ার্ডের লন্ডনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সামুদ্রিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক মিশেল উইজ বকম্যানের মতে, বিকল্প পরিবহনপথটি যত বেশি কার্যকর হচ্ছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা ততই কমছে। এ কারণেই দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর হামলা বাড়ছে বলে তার ধারণা। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়ে জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। বকম্যানের ভাষ্য, ওমান এই আইনি কাঠামোর আওতায় জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা দিয়ে সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে ভূমিকা রেখেছে। তবে বিকল্প পথ চালু থাকলেও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে। ইরান যদি নিয়মিত হামলা চালায়, তাহলে জ্বালানি পরিবহনের সময়, ব্যয় ও ঝুঁকি- সবই বাড়তে পারে। মাইন আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা? হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন থাকার আশঙ্কাকেও সামনে আনছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালির বিভিন্ন স্থানে মাইন পেতে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করে জাহাজ চলাচল করলে গুরুতর বিপদের মুখে পড়তে পারে- এমন বার্তা দিচ্ছে আইআরজিসি। বাহিনীটির দাবি, সপ্তাহান্তে মাইনের আঘাতে তিনটি ট্যাংকারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া মাইনের আঘাতে একটি জাহাজে আগুন ধরে যাওয়ার দৃশ্যও প্রকাশ করেছে তারা। তবে প্রকাশিত ভিডিওতে মাইন বিস্ফোরণের দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। এ ধরনের দাবির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজগুলোর ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইরানের আইআরজিসি কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দর এবং নোঙর এলাকায় থাকা ট্যাংকারগুলোকে হুমকি দিয়েছিল। ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওই হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেছিল বাহিনীটি। একই সঙ্গে দেশ দুটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থানের সুযোগ দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগ তোলে তেহরান। সৌদি আরবকেও জড়াল তেহরান রেজাইয়ের বক্তব্যে সৌদি আরবের নামও এসেছে। ইরানের বিধিনিষেধ এড়িয়ে তেল পরিবহনে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে সৌদি রাজধানী রিয়াদে সরাসরি হামলার হুমকি দেননি। এমন সময় এই অভিযোগ এল, যখন ইয়েমেনের ইরানঘনিষ্ঠ হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে সৌদি আরব। ফলে হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক উত্তেজনা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশকেও আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে। রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ কেবল, তথ্যকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হরমুজ প্রণালির আশপাশের এলাকায় এসব স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি। এতে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাড়বে অর্থনৈতিক চাপ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরতে পারেনি, উইন্ডওয়ার্ডের পরিসংখ্যানেও তার প্রতিফলন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৩১টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধের আগে এই সংখ্যা ছিল ১৩৮। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ইরানের লক্ষ্যবস্তু হওয়া ৪৫টি জাহাজের ৮৭ শতাংশই ছিল ট্যাংকার। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জাতীয় জ্বালানি কোম্পানির জাহাজ। হামলার ৯৩ শতাংশ ঘটেছে হরমুজ প্রণালিতে। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হামলার শিকার হয়েছে বলে উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাহাজভাড়া ব্যাপকভাবে বেড়েছে। উইন্ডওয়ার্ডের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে উপসাগরীয় অঞ্চলের অপরিশোধিত তেলের মোট ব্যয়ের মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ ছিল পরিবহন খরচ। এখন তা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোকে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সরকারি বা আনুষ্ঠানিক বিক্রয়মূল্যের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ৩৫ ডলার পর্যন্ত ছাড় দিতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যয়বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ পথে তেল পরিবহনে রাজি এমন ট্যাংকারের সংকট। উইন্ডওয়ার্ডের হিসাবে, বিশ্বের অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অদক্ষ ও জটিল পরিবহনব্যবস্থায় আটকে রয়েছে। ছোট জাহাজ থেকে বড় ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর, বন্দরে ও নোঙর এলাকায় হামলার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এ ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বকম্যানের ভাষায়, এর প্রভাব এক ধরনের ধারাবাহিক সংকট তৈরি করছে- যা বিভিন্ন শ্রেণির জাহাজের পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা ইরানের দাবি, যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের দেওয়া সাতটি শর্তের কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। তবে সব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও চুক্তি হবে না বলে স্পষ্ট করেছে ইরান। আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারছে- এমন মূল্যায়ন থেকেই তেহরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য তাদের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিশ্লেষণে আজিজি প্রশ্ন তুলেছেন, সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য ইরানের ওপরও ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এই চাপ দীর্ঘদিন ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে তেহরান অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ছে কি না। তাই বলা যায়- বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও হামলার ঝুঁকি, বাড়তি জাহাজভাড়া এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা কাটতে দিচ্ছে না। হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রফতানিতে নয়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপরও পড়তে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

হরমুজে ইরানের নতুন চাল, বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো

সৌদি ও ইয়েমেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংলাপে সহায়তার প্রস্তাব ইরানের

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে তেহরান সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন আরাগচি। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি বিমানবন্দরে হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রোববার (১১ অক্টোবর) টেলিগ্রামে এক বার্তায় আরাগচি বলেন, রাজনৈতিক সমাধানের পথ বাদ দিয়ে সামরিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটগুলোর কোনো সামরিক সমাধান নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু এবং রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ইরান প্রস্তুত বলেও জানান আরাগচি। এর আগে রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইয়েমেন নিয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকা পুনর্বিবেচনার কথা বলেছেন। ইরানের ওপর আবার হামলার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন বলে জানান তিনি। যদিও বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা হবে না। নতুন বক্তব্যে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত মিলছে। দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু রয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে রাজি হয়। এর আগে সাত বছর ধরে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর তেহরানের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ওই যুদ্ধের পর ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রও এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইরানকে গত মার্চে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান সতর্ক করে বলেছিলেন, সৌদি আরব ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার বিষয়টি আর অনির্দিষ্টকাল সহ্য করা হবে না। তিনি তেহরানকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সূত্র: আলজাজিরা

সৌদি ও ইয়েমেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংলাপে সহায়তার প্রস্তাব ইরানের

হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানে যোগ দিতে পারেন ট্রাম্প

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে ওয়াশিংটন বিবেচনা করছে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।  শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে হামলার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে যুক্ত হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমরা যোগ দিতে পারি। বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব। আমরা এইমাত্র সর্বশেষ হামলার খবর পেয়েছি। তাই সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিব।” ট্রাম্পের এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ১২, আহত তিন শতাধিক সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০০ জনের বেশি; সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আহতের সংখ্যা ৩০৯। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চার সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি বাংলাদেশের দু’জন নাগরিকও রয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক নিহত হয়েছেন। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। রিয়াদগামী উড়োজাহাজ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বিমানবন্দর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আহত ব্যক্তিদের অনেককে অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। এ হামলার পর সৌদি আরবে থাকা নিজ দেশের নাগরিকদের বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনা নিরীহ মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার পরিচয় দেয়। একই সপ্তাহে একাধিক হামলা রিয়াদের বিমানবন্দরে শনিবারের হামলাটি ছিল ওই সপ্তাহে সেখানে তৃতীয় হামলা। এর আগে হওয়া দুটি হামলায়ও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আগের হামলাগুলোতে চারজন নিহত হন এবং বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সর্বশেষ হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রী চলাচল ও উড়োজাহাজের সময়সূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর কয়েকটি এর আগেই রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত বা বাতিল করেছিল। হুতিরা আগের কয়েকটি হামলার দায় স্বীকার করলেও শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে এবং কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইয়েমেনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াই নতুন করে তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরবের ওপর হামলাও বেড়েছে। গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের যুদ্ধেও পড়েছে। হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি ঘিরেও উত্তেজনা বেড়েছে। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও চলতি বছরের জুলাইয়ে তা ভেঙে পড়ে। এরপর দুই পক্ষের লড়াই আবার তীব্র হয়ে ওঠে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী সম্প্রতি হুতিদের দখলে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে। এ অভিযানে সৌদি আরব আকাশপথে সহায়তা দিচ্ছে। অন্যদিকে, হুতিদের হামলা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে বাড়তে পারে উত্তেজনা সৌদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে এখনও সামরিক অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করছে সৌদি আরবের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ এবং হুতিদের পরবর্তী অবস্থানের ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা বিডি প্রতিদিন/একেএ

হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানে যোগ দিতে পারেন ট্রাম্প

স্মার্ট অস্ত্র ও নতুন কৌশলে শক্তিশালী হচ্ছে ইরানের সেনাবাহিনী

স্মার্ট প্রযুক্তির আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংযোজন এবং নতুন যুদ্ধকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে ইরানের সেনাবাহিনীর পদাতিক বাহিনী। একই সঙ্গে বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সার্বিক প্রস্তুতি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী জাহানশাহী। জেনারেল জাহানশাহী জানান, মাঠপর্যায়ের পদাতিক ইউনিটগুলোকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এবং নেটওয়ার্কযুক্ত আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে। বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধপ্রস্তুতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসব পদ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের যেকোনো সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই উন্নয়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। সম্প্রতি ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা বা আগ্রাসন প্রতিহত করতে প্রয়োজনবোধে ভবিষ্যতে অগ্রিম বা প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযান চালানো হবে। ইতোমধ্যে বিগত সংঘাতের সময়ও এই ধরণের প্রতিরোধমূলক হামলা সফলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে বলে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। গত ৭ অক্টোবর ইরানের সেনাবাহিনী তাদের সামরিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা প্রকাশ করে। নতুন এই কৌশল অনুযায়ী, বাহিনীটি তাদের প্রথাগত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সরে এসে আক্রমণাত্মক ও প্রতিহত করার নীতি গ্রহণ করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলোর হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা নস্যাৎ করে দিতে আগাম হামলা চালানোর নীতিকেই এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইরান। সূত্র: আল মায়াদিন 

স্মার্ট অস্ত্র ও নতুন কৌশলে শক্তিশালী হচ্ছে ইরানের সেনাবাহিনী

যুদ্ধের আগের তুলনায় বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ এখনও অনেক কম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তেল শিল্প ও বাজার বিভাগের সাবেক প্রধান নিল অ্যাটকিনসন বলেছেন, জি-৭ দেশগুলোর জ্বালানি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত স্বাগত জানানোর মতো হলেও এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের মূল সংকটের সমাধান হচ্ছে না। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অ্যাটকিনসন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর সাত মাস পরও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের তুলনায় ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কম’ রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সংকটের মূল মনোযোগ গিয়ে পড়েছে জ্বালানির চূড়ান্ত ব্যবহার পর্যায়ে, বিশেষ করে ডিজেলের ওপর। কারণ ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়াই এখন বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। ডিজেল সরবরাহ কমার তিন কারণ অ্যাটকিনসনের মতে, বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে আগের মতো ডিজেল যাচ্ছে না। ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও কুয়েত থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানি করে আসছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের কারণে সেই সরবরাহ এখন কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া এখন ডিজেল রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন ও রফতানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অ্যাটকিনসন বলেন, ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারগুলোতে হামলার কারণে রাশিয়া এখন আর ডিজেল রফতানি করছে না। তৃতীয়ত, চীনও ডিজেল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে আগে যেসব বড় সরবরাহকারী দেশ থেকে ডিজেল পাওয়া যেত, তাদের কয়েকটি এখন বাজারে আগের মতো জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না। চাহিদা কমছে না, বরং বাড়তে পারে সরবরাহ কমে গেলেও ডিজেলের বৈশ্বিক চাহিদা তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। ফলে বাজারে ঘাটতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অ্যাটকিনসনের মতে, কৃষিপণ্যের ফসল কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। কৃষিকাজে ট্রাক্টর, হারভেস্টার, পাম্প, পরিবহনসহ বিভিন্ন যন্ত্রে ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফলে এ সময় জ্বালানিটির চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি থাকে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে এবং কৃষিপণ্যের ফসল কাটার মৌসুমের কারণে এই চাহিদা উচ্চ পর্যায়েই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জি-৭’র মজুত ছাড়েও কাটছে না সংকট বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে জি-৭ দেশগুলোর কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অ্যাটকিনসন। তবে তার মতে, এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে বাজারে স্বস্তি দিতে পারলেও বৈশ্বিক সরবরাহ ঘাটতির মৌলিক সমস্যার সমাধান করবে না। কারণ, একদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে ডিজেলের সরবরাহ কমেছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীরাও বিশ্ববাজারে আগের মাত্রায় ডিজেল দিচ্ছে না। একই সময়ে কৃষি মৌসুমকে কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ছে। ফলে যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থা পুনরুদ্ধার না হলে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সংকট সহজে কাটবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ ঘাটতি অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানির দামে নয়, পরিবহন ব্যয় ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্যেও পড়তে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা বিডি প্রতিদিন/একেএ

যুদ্ধের আগের তুলনায় বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ এখনও অনেক কম

মধ্যপ্রাচ্যের পথে রণতরী ও ১০ হাজার মার্কিন সেনা, ইরান যুদ্ধ কি আরও তীব্র হতে চলেছে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অষ্টম মাসে পা দিয়েছে। এর মধ্যেই ইরানের কাছাকাছি জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এক মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত ৯ থেকে ১০ হাজার সেনা পাঠানো হচ্ছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে এমন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো। চলমান এই যুদ্ধ ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এরই মধ্যে তলানিতে ঠেকেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ গত রোববার সান ডিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এর এক দিন পরই মাকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনরি ইউনিট (এমইইউ) যাত্রা শুরু করে, যার সঙ্গে দুই হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই রণতরী ও নৌবহর মোতায়েনের ফলে সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত হতে পারে। ওই মার্কিন কর্মকর্তার মতে, আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে ইরানের কাছাকাছি এলাকায় তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং দুটি উভচর ল্যান্ডিং গ্রুপ অবস্থান করবে। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখনই কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, তার সামনে বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।  মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি বিমান মোতায়েন  যুক্তরাষ্ট্র বিগত দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে আসছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স এবং সামরিক ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বিমান মোতায়েন করেছে। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার অতিরিক্ত সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।  সেনা মোতায়েন কি যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত  নতুন সেনা মোতায়েন যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গত বৃহস্পতিবার টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি ইরানে বোমাবর্ষণ বাড়ানোকে সম্ভব বলে মনে করছেন।  কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ওই অঞ্চলে আরও সেনা পাঠানো ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের একটি নতুন দরকষাকষির কৌশল হতে পারে। গত সপ্তাহে ইরান হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাব পাঠালেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটন চায় কোনো শর্তে রাজি হওয়ার আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে।  ব্যাপক পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি ইরানের  যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার বড় পরিসরে সামরিক হামলা চালায়, তবে আরও ব্যাপক ও কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। তবে একই সঙ্গে তেহরান কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি এবং ইরানের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু বাড়ানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার বাইরেও যেসব দেশ মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন করে, সেসব দেশে হামলার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকতে পারে।  সৌদি ও কাতারে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক সপ্তাহে সৌদি আরব এবং কাতারের তেল ও গ্যাস স্থাপনা রক্ষার জন্য আরও দুটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের জ্বালানি স্থাপনা রক্ষা করবে– এই আশ্বাস দিতেই পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পথে রণতরী ও ১০ হাজার মার্কিন সেনা, ইরান যুদ্ধ কি আরও তীব্র হতে চলেছে

ইরান ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বাড়ছে

ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টকে কেন্দ্র করে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো ঘাঁটি ছেড়েছে। একই সঙ্গে ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড-এর নেতৃত্বে একটি উভচর হামলা ইউনিটও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। এতে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ওই অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরী ও দুটি উভচর অবতরণকারী ইউনিট অবস্থান করতে পারে। মাকিন আইল্যান্ডের সঙ্গে দুই হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী- ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন—অবস্থান করছিল। নতুন মোতায়েন সম্পন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান শক্তির উপস্থিতি আরও বড় আকার নেবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, নতুন মোতায়েনে অতিরিক্ত প্রায় ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার সেনা যুক্ত হতে পারে। এই সামরিক তৎপরতা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অচলাবস্থায় রয়েছে। ইরান কাতারের মাধ্যমে সাত দিনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, পারমাণবিক আলোচনা শুরু এবং আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে মার্কিন নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব ছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন এবং নতুন হামলার সম্ভাবনাও সামনে রেখেছেন। ইরানও সম্ভাব্য নতুন হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তেহরানের সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য পাল্টা হামলার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন বলে সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে সংস্থাটি। ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন মার্কিন সামরিক মোতায়েনের প্রভাব ইতোমধ্যে আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ার খবরে শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়লেও ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও সামনে রয়েছে। তথ্য সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান। বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ

ইরান ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বাড়ছে
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream