বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ Bangladesh Development Update প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের নিচের দিকে থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬২ শতাংশ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সরকারের বিপুল ভর্তুকির একটি অংশ তুলনামূলকভাবে সচ্ছল জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি, দারিদ্র্য, সামাজিক সুরক্ষা ও ভর্তুকি ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দরিদ্র মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার ওপর।
দরিদ্রদের বড় অংশই সামাজিক সুরক্ষার বাইরে
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে সমাজের নিচের ২০ শতাংশ এবং ওপরের ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার তুলনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের মধ্যে মাত্র ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরাসরি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান। অর্থাৎ প্রায় ৪৬ শতাংশ দরিদ্র মানুষ কোনো না কোনোভাবে এসব কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন।
অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের প্রায় ৩১ শতাংশও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সরাসরি সুবিধা পান। এতে বোঝা যায়, দরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত সরকারি সহায়তা সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করা না গেলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকার সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। বিপরীতে সবচেয়ে ওপরের ২০ শতাংশ ধনী মানুষ বছরে গড়ে ১০ হাজার ৪৭২ টাকার সুবিধা পান।
ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমানোর সম্ভাবনা
দরিদ্র মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। তবে কার্ডের সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করাই এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মার মতে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা বিতরণ করা হলে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলা সম্ভব হতে পারে। তবে দরিদ্রদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে কার্ডের সুবিধা দেওয়া গেলে এ সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ২৮ লাখে পৌঁছাতে পারে।
এ জন্য দারিদ্র্য নির্ধারণে স্বীকৃত মানদণ্ড ব্যবহার, নগদ সহায়তার প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করা, খাদ্য সহায়তার তালিকা পুনর্বিন্যাস এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বয় করার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
খাবারে আয়ের বড় অংশ ব্যয় দরিদ্রদের
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, দেশের নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষকে খাবার কিনতেই তাদের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। ফলে খাদ্য ও কৃষি খাতে কার্যকর বিনিয়োগ এবং ভর্তুকির সঠিক বণ্টন দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের বড় একটি অংশ ভর্তুকিতে চলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়তে থাকায় কৃষি খাতের গবেষণা, সম্প্রসারণ, বাজারজাতকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ভর্তুকির বড় অংশ ধনীদের সুবিধায়
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, সমাজের নিচের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির ১৫ শতাংশের কিছু বেশি পান।
অন্যদিকে ওপরের ২০ শতাংশ তুলনামূলক ধনী মানুষ পান প্রায় ৩৩ শতাংশ ভর্তুকি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সমাজের সবচেয়ে সচ্ছল অংশের কাছে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের যুক্তি, যেসব পরিবার বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তারা স্বাভাবিকভাবেই ভর্তুকির সুবিধাও বেশি পায়। ফলে দরিদ্র মানুষের সুরক্ষার লক্ষ্য থাকলেও বর্তমান ব্যবস্থায় ভর্তুকির বড় অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
সারে ভর্তুকি বেড়েছে চার গুণ
কৃষি খাতেও ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা—অর্থাৎ প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি।
২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিতে ব্যয় করতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ কৃষকদের লক্ষ্য করে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ সেবা, মাটি পরীক্ষা, বাজারজাতকরণ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য দুটিই বাড়ছে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির কথাও উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, গত বছরের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নারীদের কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
জাতীয় দারিদ্র্যসীমার হিসাবে, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।
জিডিপির ৩.৫ শতাংশ ব্যয়, তবুও বাদ পড়ছেন দরিদ্ররা
বিশ্বব্যাংক বলছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করছে। কিন্তু এত বড় ব্যয়ের পরও দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র পরিবার কাঙ্ক্ষিত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির মূল বার্তা হলো—শুধু ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তায় অর্থ ব্যয় বাড়ালেই হবে না; সেই অর্থ প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ, তথ্যভান্ডার হালনাগাদ এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্য কমাতেও তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মতামত