দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ-অবরুদ্ধ
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালতের আদেশে সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থপাচার মামলায় এসব সম্পদের বিষয়ে আদালতের আদেশ পাওয়া গেছে।
এসব সম্পদের মধ্যে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, বিনিয়োগসহ নানা ধরনের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান ও পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে সরকারের একাধিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
দেশে ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আদালতের আদেশের আওতায় থাকা সম্পদের বড় অংশই দেশে রয়েছে। দেশে থাকা সম্পদের মূল্য ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের মূল্য ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
অন্যদিকে বিদেশে থাকা সম্পদের মূল্য প্রায় ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের মূল্য ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
দেশি ও বিদেশি সম্পদ মিলিয়ে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা
অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদসংক্রান্ত অনুসন্ধানে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপের নাম রয়েছে।
এসব মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে।
প্রথম ধাপে ছয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠী
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ছয়টি মামলা নিয়ে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপ।
ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ অবৈধভাবে স্থানান্তর বা বিদেশে পাচারের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর অর্থ উদ্ধারে দেওয়ানি আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ, বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের তথ্য এবং ঋণ গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় এসব মামলা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে আরও ঋণগ্রহীতা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
১৪২ মামলা, ১৫৮ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা
পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৪২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় হয়েছে।
অর্থপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশত্যাগ এবং সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি ঠেকাতে ১৫৮ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশের অনুরোধ পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিদেশে সম্পদ উদ্ধারে আইনি সহায়তা
বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তার মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে।
পাশাপাশি অর্থপাচারের গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত কয়েকটি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি বা এমএলএটি করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়েছে বলে সরকারি তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এই কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করছে।
টাস্কফোর্স ও যৌথ তদন্ত কার্যক্রমে দুদক, সিআইডি, এনবিআরের গোয়েন্দা ইউনিট, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো যুক্ত রয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে আলাদাভাবে কাজ করার পাশাপাশি সমন্বিত বা কনসোর্টিয়ামভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান ও আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি আইনি ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পদ ফেরত আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ, সংযুক্ত বা অবরুদ্ধ করার তথ্য অর্থপাচারবিরোধী কার্যক্রমের বড় পরিসর তুলে ধরছে। তবে এসব সম্পদ এখনো সরকারের হাতে নগদ অর্থ হিসেবে ফিরে আসেনি; আদালতের আদেশে সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা এবং তা বাস্তবে দেশে ফিরিয়ে আনা—দুটি পৃথক আইনি প্রক্রিয়া। বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও অগ্রগতি নির্ভর করবে।
মতামত