প্রাক্তনকে ভুলতে কত সময় লাগে?
প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—প্রাক্তন মানুষটিকে পুরোপুরি ভুলে যেতে কতটা সময় লাগে? কয়েক মাস, কয়েক বছর, নাকি তার চেয়েও বেশি?
এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রাক্তন সঙ্গীর প্রতি তৈরি হওয়া আবেগগত বন্ধন ধীরে ধীরে কমে আসে এবং এই প্রক্রিয়াটি মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক দীর্ঘ হতে পারে।
আবেগ অর্ধেক কমতেই লাগে ৪ বছরের বেশি
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের মনোবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক জিয়া ওয়াই. চং ও আর. ক্রিস ফ্রেলি এ বিষয়ে গবেষণা করেন। গবেষণাটি ২০২৫ সালে Social Psychological and Personality Science সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় ৩২৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। তাঁদের প্রত্যেকের অন্তত দুই বছর স্থায়ী একটি প্রেমের সম্পর্ক ছিল, যা পরবর্তী সময়ে ভেঙে যায়। অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৩০-এর কোঠায় এবং তাঁদের আগের সম্পর্ক গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৬ বছর স্থায়ী হয়েছিল।
গবেষকেরা বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের প্রাক্তন সঙ্গীর প্রতি আবেগগত টান পরিমাপ করেন। একই ধরনের প্রশ্ন একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়েও করা হয়। এর মাধ্যমে প্রাক্তনের প্রতি মানসিক সংযুক্তি একজন অপরিচিত ব্যক্তির তুলনায় কতটা বেশি, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে অধিকাংশ মানুষের প্রাক্তন সঙ্গীর প্রতি আবেগগত বন্ধন ধীরে ধীরে কমে আসে। তবে এই পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটে না।
গবেষকদের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাক্তনের প্রতি আবেগগত বন্ধন ৫০ শতাংশ কমতে গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ১৮ বছর সময় লাগে। একই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকলে আবেগগত বন্ধন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি যেতে প্রায় আট বছর সময় লাগতে পারে।
আট বছর মানেই সবাই প্রাক্তনকে ভুলে যাবেন?
এখানেই বিষয়টি একটু পরিষ্কার করা জরুরি। গবেষণার ফলাফলের অর্থ এই নয় যে, বিচ্ছেদের ঠিক আট বছর পর প্রত্যেক মানুষ তার প্রাক্তনকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাবেন।
গবেষণায় মূলত আবেগগত সংযুক্তি কমে যাওয়ার সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আট বছরকে কোনো নির্দিষ্ট বা সবার জন্য প্রযোজ্য সময়সীমা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
কারও ক্ষেত্রে এই আবেগ অনেক দ্রুত কমে যেতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের বহু বছর পরও প্রাক্তনের প্রতি কিছুটা আবেগ বা টান থেকে যেতে পারে।
যোগাযোগ রাখলে আবেগ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। বিচ্ছেদের পরও যদি প্রাক্তন সঙ্গীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় থাকে, তাহলে আবেগগত বন্ধন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
এ ছাড়া যেসব মানুষের মধ্যে উদ্বেগপ্রবণতার মাত্রা বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রাক্তনের প্রতি আবেগ তুলনামূলক দীর্ঘ সময় ধরে থাকার প্রবণতা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, প্রাক্তন সঙ্গীর সঙ্গে সন্তান থাকলে শুরুতে আবেগগত বন্ধন তুলনামূলক বেশি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেই বন্ধন সন্তানহীন সাবেক দম্পতিদের তুলনায় দ্রুত কমার প্রবণতা দেখা গেছে।
নতুন সম্পর্কে গেলেই কি পুরোনো আবেগ দ্রুত কমে?
গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফল হলো—নতুন সম্পর্কে জড়ানো কিংবা নারী-পুরুষের পার্থক্য প্রাক্তন সঙ্গীর প্রতি আবেগগত বন্ধন কত দ্রুত কমবে, সেটিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেনি।
অর্থাৎ, নতুন সম্পর্কে গেলেই আগের সম্পর্কের আবেগ দ্রুত মুছে যাবে—এমন কোনো নিশ্চিত নিয়ম গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
‘ভুলে যাওয়া’ আসলে কী?
প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়া মানেই তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি স্মৃতি মুছে যাওয়া নয়। অনেক বছর পরও কারও কথা মনে পড়তে পারে, পুরোনো কোনো জায়গা বা গান স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগের তীব্রতা কমে আসতে পারে।
গবেষণাটিও মূলত এই আবেগগত সংযুক্তি কমে যাওয়ার প্রক্রিয়াটিকেই গুরুত্ব দিয়েছে।
সবার জন্য সময়টা এক নয়
বিচ্ছেদের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। সম্পর্ক কতদিনের ছিল, বিচ্ছেদের পরিস্থিতি কেমন ছিল, প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না—এসব বিষয় ব্যক্তিভেদে অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই গবেষণার আট বছরের হিসাবকে নিজের জীবনের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। কারও ক্ষেত্রে কয়েক মাসেই আবেগ অনেকটা কমে আসতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া কয়েক বছর ধরে চলতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট ঘড়ি নেই। সময়ের সঙ্গে আবেগের তীব্রতা সাধারণত কমে আসে, তবে প্রত্যেক মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতা আলাদা। তাই বিচ্ছেদের পর নিজেকে সময় দেওয়া এবং নিজের স্বাভাবিক জীবনে ধীরে ধীরে ফিরে আসাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
মতামত