বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটে বাধা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে মজুদ কমে যাওয়ার কারণে আসন্ন শীত মৌসুমে তেলের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে—এমন সতর্কতাও উঠে এসেছে।
শীত মৌসুম ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
শীত মৌসুমে সাধারণত বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ব্যবহারের চাহিদা বাড়ে। এর মধ্যে যদি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বাজারে ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপে শীত শুরুর আগে গ্যাস ও জ্বালানি মজুদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইউরোপের গ্যাস মজুদ দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি থাকার খবরও পাওয়া যায়।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে ডিজেলের মজুদ কমে আসায় আগামী বছরেও সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতি জ্বালানি ব্যয়কে দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর আরও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০০ ডলারের সতর্কতা
চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের তীব্রতার মধ্যে বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করেছিলেন, সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। একই সময়ে কিছু বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আগের রেকর্ড মূল্যও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে ২০০ ডলারের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত মূল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত সরবরাহ পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, উৎপাদন এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির হিসাব।
বাংলাদেশের জন্য কী ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, দেশে তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা নেই এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন খরচ এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।
মজুদ পরিস্থিতিই বড় বিষয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, বিভিন্ন দেশে পরিশোধিত জ্বালানি ও ডিজেলের মজুদ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ সংকট ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্তও অব্যাহত থাকতে পারে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে আসন্ন শীত মৌসুমে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি, সরবরাহপথে বাধা এবং মজুদ কমে যাওয়ার বিষয়গুলো একসঙ্গে চাপ তৈরি করলে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তবে সংকটের মাত্রা কতটা হবে, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর।
মতামত