দেশে পানির পরিমাণ পর্যাপ্ত হলেও শিল্পবর্জ্য ও বিভিন্ন ধরনের দূষণের কারণে পানির একটি বড় অংশ মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পানি ভবনে আয়োজিত ‘বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬ উদযাপন ও মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড গিভিং’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকার আশপাশের শিল্পবর্জ্যে বাড়ছে দূষণ
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির পরিমাণ কম নয়। তবে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও অন্যান্য দূষণের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেই পানি মানুষের ব্যবহারের উপযোগী থাকছে না।
বিশেষ করে ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা ১১টি শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য পরিবেশ ও পানির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি। শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদী, খাল ও জলাশয় রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়ছে চাপ
শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শুধু গভীর নলকূপ স্থাপন করে ভবিষ্যতের পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, নির্বাচনী এলাকায় গেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায়ই গভীর নলকূপ স্থাপনের আবেদন আসে। কিন্তু কোনো এলাকায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ মানুষের বিপরীতে বছরে ৩০০ থেকে ৫০০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করলেও সবার সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পানির প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভবিষ্যতে সুপেয় পানি নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা
পানির সংকটের সম্ভাব্য ভয়াবহতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, তেলের জন্য যেমন বিশ্বে সংঘাত ও প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সুপেয় পানির জন্যও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এমনকি অর্থ থাকলেও ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। এটি তাঁর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে দেওয়া একটি সতর্কবার্তা।
দূষিত পানিতে গোসল করাও নিরাপদ নয় বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। কোথাও কোথাও দূষিত পানিতে মাছ চাষ করা হলেও সেই মাছ মানুষের খাওয়ার উপযোগী কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় পানিতে বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে বলেও জানান তিনি।
পানির সংকট মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান
পানির সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান পানিসম্পদমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকারের একার পক্ষে পরিবেশ ও পানির উৎস রক্ষা করা সম্ভব নয়। নদী-খাল রক্ষা, খাল পুনঃখনন এবং জলাশয়ের পরিবেশ সংরক্ষণে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বর্তমান প্রজন্মকে পানি ও পরিবেশের সম্পদ এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এসব সম্পদের সুফল পেতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরার তাগিদ
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ক্ষতির কারণে বাংলাদেশ যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
তিনি বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের অধিকার ও দাবিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
পানির উৎস সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদী-খাল রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে সুপেয় পানির সংকট আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে অনুষ্ঠানে সতর্ক করা হয়।
মতামত