গাজীপুরের পূবাইল এলাকায় একটি রিসোর্টে আয়োজিত ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও এসআরবির সদস্যরা।
শুক্রবার রাতে পূবাইলের ‘পূবাইল রিসোর্ট ক্লাব’-এ ‘সনিক প্লাস’ ব্যানারে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রায় ৬০০ জনের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ ছিল কিশোর-কিশোরী।
মাদক সরবরাহের তথ্য পাওয়ার পর অনুষ্ঠানস্থলে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এ সময় অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত চারজনকে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে কোকেন, কুশ ও বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (২৯), তুষার আহমেদ (৩২), মহিদুল ইসলাম (২৮) ও কাসফিয়া নিশাত (২৫)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার চারজনই ওই ডিজে পার্টি আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীদের কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় শনিবার গাজীপুরের পূবাইল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, গোপন গ্রুপে অংশগ্রহণকারী
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, ডিজে পার্টি ও ব্যক্তিগত আয়োজনকে মাদক সরবরাহ ও সেবনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
এসব অনুষ্ঠানের প্রচার অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গোপন অনলাইন গ্রুপ তৈরি করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের যুক্ত করার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঢাকা গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, কিছু বিনোদনমূলক আয়োজনকে মাদক সরবরাহ ও সেবনের জন্য ব্যবহারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব আয়োজনের প্রচার, অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মাদক সরবরাহের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাদক সরবরাহের উৎস, জড়িত ব্যক্তি এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে গোয়েন্দা কার্যক্রম ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
টিকিটের দাম ৬ থেকে ১২ হাজার টাকা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে এসব অনুষ্ঠানের জন্য টিকিট বিক্রি করা হয়। অনুষ্ঠানভেদে একজন অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কর্মকর্তারা জানান, পার্টি শুরু হওয়ার পর নির্ধারিত মাদক সরবরাহকারীরা অনুষ্ঠানস্থলের ভেতরে অংশগ্রহণকারীদের কাছে বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে মাদক সেবনের পরিবেশও তৈরি করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঢাকা, গাজীপুর ও কক্সবাজারের বিভিন্ন রিসোর্টে নিয়মিতভাবে এ ধরনের আয়োজন করা হচ্ছে। এসব আয়োজনের সঙ্গে একাধিক গ্রুপ জড়িত থাকার তথ্যও তদন্তে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
গাজীপুরের রিসোর্টগুলোকে সতর্কতা
ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ সামনে আসার পর গাজীপুরের রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
গাজীপুরের উপপরিচালক এমদাদুল হক বলেন, এ ধরনের আয়োজনের তথ্য পাওয়ার পর জেলার রিসোর্ট মালিক ও কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে। মাদক সরবরাহ বা সেবনের উদ্দেশ্যে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য রিসোর্ট ভাড়া না দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের সতর্ক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগেও গাজীপুরে ডিজে পার্টিতে অভিযান
এর আগে গত এপ্রিল মাসে গাজীপুর সদর উপজেলার নলজানি এলাকার একটি রিসোর্টে ডিজে পার্টি চলাকালে অভিযান চালানো হয়। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা ওই অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানে ৯টি এক্সটেসি, ৫ গ্রাম কুশ, ১৬৫ গ্রাম ক্যানাবিস চকলেট, ১০১টি বিয়ার ও তিন বোতল ভদকা জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন জানিয়েছিলেন, ওই ডিজে পার্টিতে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া যায়। আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্টদের একজন রিসোর্টটি ভাড়া করেছিলেন বলে জানানো হয়েছিল।
মতামত