ঢাকা    সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
জান্নাতুল হত্যার রহস্য উদঘাটন, পরিকল্পনা করে দ্বিতীয় স্বামী

জান্নাতুল হত্যার রহস্য উদঘাটন, পরিকল্পনা করে দ্বিতীয় স্বামী

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর শাখা শিকলবাহা খাল থেকে বস্তাবন্দি ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত নারীর হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিহত নারীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি সাম্পান নৌকাও জব্দ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে গৃহবধূ জান্নাতুল ফেরদৌসকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানায় করা মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই। জানা গেছে, নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের নুরুল ইসলামের মেয়ে। তিনি ‘ম্যাপ সুজ লিমিটেড’ নামের একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানার বাইরে সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় নাছির উদ্দিনের ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজুর সঙ্গে বসবাস করতেন। পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের প্রায় তিন বছর পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়ার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে জান্নাতুলের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দেন। তবে তার আগে থেকেই রুবি আক্তার নামে একজন স্ত্রী ছিলেন, যিনি শিকলবাহায় নিজের বাড়িতে বসবাস করতেন। পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, বিয়ের কিছুদিন পর রাজা মিয়ার প্রথম বিয়ের বিষয়টি জানতে পারেন জান্নাতুল। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে জান্নাতুলকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেন রাজা মিয়া। এ কাজে তিনি পূর্বপরিচিত মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের কাছেও ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এসব চেষ্টায় সমস্যার সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনায় এগোতে থাকেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজা মিয়া জান্নাতুলকে বেড়ানোর কথা বলে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ের ব্রিজঘাটা এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুজুর আহম্মদ এবং আরও একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি একটি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তারা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালের দিকে যায়। নৌকাটি চালান মুসলিম উদ্দিন এবং শুজুর আহম্মদ নৌকা থেকে পানি সেচছিলেন। রাত ৮টার পর নৌকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রাজা মিয়া জান্নাতুলের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন। এরপর তার মুখ চেপে ধরা হয় এবং রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। জান্নাতুলের মৃত্যু হলে তার হাত-পা বেঁধে লাশ বস্তায় ভরা হয়। কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের দিকে শিকলবাহা খালে লাশটি ফেলে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাটা এলাকায় ফিরে যান। এরপর তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করলেও একপর্যায়ে আত্মগোপনে চলে যান। গত ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের কর্ণফুলী থানাধীন শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি এক নারীর লাশ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌপুলিশ। লাশটির হাত-পা বাঁধা ছিল। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা লাশটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন। এ সময় তার স্বামী রাজা মিয়াকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহ করেন পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় নিহতের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে ৩ আগস্ট রাজা মিয়া ওরফে রাজুসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন। পিবিআই জানায়, গত ৬ অক্টোবর মামলাটি তাদের তফসিলভুক্ত হওয়ায় সদরঘাট নৌপুলিশের কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়।  গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ অক্টোবর অভিযান পরিচালনা করে কক্সবাজারের টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুজুর আহমদকে (২৪) গ্রেফতার করা হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটি তার হেফাজত থেকে উদ্ধার করে জব্দ করা হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতার মুসলিম উদ্দিনকে বুধবার (১৪ অক্টোবর) আদালতে হাজির করা হয়। তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততা এবং ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

ধানক্ষেতে ছাত্রীর লাশ: ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি সুমনের

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে (১৫) ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া (৩৫) আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাকে কুমিল্লা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে ৩টায় কুমিল্লার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ৬ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মমিনুল হকের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার জন্য সুমনকে হাজির করা হয়। সেখানে ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় সে। বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা আদালতের পরিদর্শক সাদেকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আজ বিকালে আদালতের বিচারক মমিনুল হকের কাছে আসামি সুমন হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। শনিবার রাত ৭টা ২০ মিনিটে তাকে কুমিল্লা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’ পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকা থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় স্কুলছাত্রীকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় তোলে সুমন। পরে লালমাইয়ের একটি ফসলি জমিতে নিয়ে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। শনিবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে কুমিল্লা জেলা পুলিশ কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত জানান জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। এ সময় লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানসহ জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ বলছে, ওই দিন রাতে স্কুলছাত্রী সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে বাসায় ফেরার জন্য সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায় উঠেছিল। শর্টকাট পথে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে চালক সুমন মিয়া তাকে নির্জন ধানক্ষেতের এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করে চালক। প্রাথমিক তদন্তে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সুমনের এককভাবে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে সুমন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর আগে গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে আটক করা হয়। ঘটনার পর পালিয়ে তার ভাইয়ের বাসায় আত্মগোপনে ছিল সুমন। পুলিশ জানায়, সুমন ভাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতো। তার বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। তবে নিজের বাড়িতে জমিজমা ও ঘর না থাকায় লালমাই উপজেলায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতো। বেশিরভাগ সময় রাতে পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী পরিবহন করতো। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ওই দিন রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় বাস থেকে নামে ওই ছাত্রী। এরপর তিশা বাস কাউন্টারের সামনে গিয়ে বাসায় ফেরার জন্য অটোরিকশা খুঁজছিল। একপর্যায়ে ৩০০ টাকা ভাড়া ঠিক করে সুমনের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে। অটোরিকশায় ওঠার পর কিছুটা সামনে গিয়ে চালককে ১০০ টাকা দেয় ছাত্রী। সেই টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনে সুমন। এরপর ছাত্রীকে শর্টকাট পথে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সুমন। পরে কুমিল্লা-চাঁদপুর সড়ক ধরে বিজরা বাজার হয়ে লালমাইয়ের দিকে যেতে থাকে অটোরিকশা। সেখানে নির্জন ও অন্ধকার একটি ধানক্ষেতের পাশে অটোরিকশা থামিয়ে দেয় চালক। ওই সময় সুমন তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। সে চিৎকার করলে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে। পরে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে সুমন। পুকুরে গোসল, জঙ্গলে রেখে যায় আইফোন ঘটনার রাতে বাবার মোবাইল ফোনে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল ওই কিশোরী। তবে তখন তার বাবা বার্তাটি দেখতে পাননি। ভোরে বার্তাটি দেখেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করতে দেখেছেন। সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ‘হত্যার পর ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি রেখে চলে যায় সুমন। পরে একটি পুকুরে গোসল করে জঙ্গলে কিশোরীর আইফোন রেখে চট্টগ্রামে চলে যায়।’ গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের বাড়ি যশোরে। পরিবারের সঙ্গে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় থাকতো।

ধানক্ষেতে ছাত্রীর লাশ: ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি সুমনের
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream