ঢাকা    সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
সিডনিতে বাংলাদেশি হস্তশিল্পের বাজার গড়ে তুলেছে ‘বোজি’

সিডনিতে বাংলাদেশি হস্তশিল্পের বাজার গড়ে তুলেছে ‘বোজি’

বাংলাদেশের প্রান্তিক কারিগরদের তৈরি পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান তৈরি করেছে সামাজিক উদ্যোগ ‘বোজি’ (Bozy)। ২০০৭ সালে সিডনিতে শাহরিয়ার চৌধুরীর হাত ধরে ‘বাংলাঅজি’ নামে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের করছে। স্বল্প পরিসরে হলেও দিন দিন এই উদ্যোগের পণ্য চাহিদা বাড়ছে জানান প্রতিষ্ঠানটি। পাট, হোগলাপাতা, বেত, বাঁশ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি ব্যাগ, ঝুড়িসহ নানা গৃহস্থালি পণ্য অস্ট্রেলীয় ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকার কামরাঙ্গীরচরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রান্তিক কারিগরদের সরাসরি যুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে এই টেকসই সরবরাহব্যবস্থা। এতে কারিগরেরা নিজ এলাকায় ঘরে বসেই ন্যায্য আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ফেয়ার-ট্রেড মেলা ও প্রদর্শনীতেও বাংলাদেশি এসব পণ্য নজর কাড়ছে। বাণিজ্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার পাশাপাশি কারিগরদের স্বাবলম্বী করে তোলাই উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য।

জাপানের মোরিওকা শহরের ঐতিহ্য ও আনন্দের উৎসব ‘সানসা ওদোরি’

জাপানের মোরিওকা শহরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আনন্দের অন্যতম প্রাণের উৎসব ‘সানসা ওদোরি’। উত্তর জাপানের ইওয়াতে প্রিফেকচারের রাজধানী মোরিওকা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য পরিচিত; আর সেই সংস্কৃতিকে মানুষের হৃদয়ের আরও কাছে নিয়ে আসে ‘সানসা ওদোরি’ মোরিওকা শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘সানসা’ শব্দটি একটি ঐতিহ্যবাহী লোকগানের সঙ্গে সম্পর্কিত; আর ‘ওদোরি’ মানে নৃত্য। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে অনুষ্ঠিত এই উৎসব মোরিওকার রাস্তাগুলোকে ঢোলের শব্দ, নৃত্য, গান এবং মানুষের আনন্দে যেন নতুন প্রাণ দেয়। মনে হয় কিছুদিনের জন্য প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাড়ি এবং প্রতিটি মানুষের হৃদয় একই ছন্দে স্পন্দিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি নৃত্য উৎসব নয়; বরং মোরিওকা ও ইওয়াতে অঞ্চলের ইতিহাস, লোকগাথা, ঐতিহ্য এবং মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা ও আনন্দের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এবার ১ থেকে ৪ আগস্ট মোরিওকা শহরের চুয়ো ওদোরি সড়কে এই অনুষ্ঠানের প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবকে ঘিরে রাস্তার দুই পাশ সুন্দর করে সাজানো হয়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নৃত্যের প্যারেড। অসংখ্য নৃত্যশিল্পী সারিবদ্ধভাবে রাস্তায় নাচতে নাচতে এগিয়ে যান। তাঁদের পরনে থাকে জাপানের ঐতিহ্যবাহী পোশাক; আর মাথায় থাকে সুন্দর অলংকার। তাঁদের সাজসজ্জা, হাসি ও নৃত্যের ছন্দ মিলিয়ে পুরো পরিবেশে যেন উৎসবের এক অপূর্ব আবেশ তৈরি হয়। এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো তাইকো ঢোলের শব্দ। শত শত ঢোল একসঙ্গে বাজতে শুরু করলে মনে হয়, পুরো শহর যেন সেই ছন্দে জেগে উঠেছে। ঢোলের প্রতিটি শব্দ যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসা কোনো প্রাচীন স্মৃতির কথা বলে। তার সঙ্গে শত শত বাঁশির সুরেলা আওয়াজ এবং নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশিত নৃত্য রাস্তার দুই পাশে জড়ো হওয়া মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে। দর্শকদের চোখে বিস্ময়, মুখে হাসি আর চারপাশে কেবল আনন্দের ঢেউ। শত শত নৃত্যশিল্পী দলবদ্ধভাবে একই ছন্দে, একই ধরনের পদক্ষেপ, হাতের নাড়াচাড়া ও শরীরের অঙ্গভঙ্গি এত সুন্দরভাবে সমন্বয় করে পরিবেশন করেন যে তা সত্যিই অবিশ্বাস্য লাগে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের তাল, একটি দলের সঙ্গে অন্য দলের ছন্দ—সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, শত শত মানুষ নয়, যেন একটি বিশাল হৃদয় একই সঙ্গে স্পন্দিত হচ্ছে। সেই দৃশ্য শুধু চোখে দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। এই উৎসবে শুধু পেশাদার নৃত্যশিল্পীরাই অংশগ্রহণ করেন না। স্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানি, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, সংগঠন, সম্প্রদায় এবং সাধারণ মানুষও বিভিন্ন দলের নামে এতে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ‘সানসা ওদোরি’ ধীরে ধীরে একটি নৃত্য অনুষ্ঠানকে ছাড়িয়ে সবার মিলনমেলায় পরিণত হয়। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মানুষ—সব বয়সের মানুষ এখানে আনন্দের অংশীদার হন। প্রজন্মের ব্যবধান যেন এই কয়েক দিনের উৎসবে কোথাও হারিয়ে যায়। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই নৃত্যের অনুশীলন করেন, যাতে উৎসবের সময় তাঁরা নিজেদের দলের সঙ্গে সুন্দরভাবে পরিবেশন করতে পারেন। তাঁদের এই দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্যে শুধু নাচ শেখার চেষ্টা থাকে না; থাকে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা, ঐতিহ্যকে ধরে রাখার দায়বদ্ধতা এবং একসঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত সৃষ্টি করার আকাঙ্ক্ষা। ‘সানসা ওদোরি’র সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো এর মাধ্যমে মোরিওকার মানুষ তাঁদের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন। এই উৎসব নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে শেখে, তরুণেরা নতুন উৎসাহ নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করে এবং এভাবেই বহু পুরোনো একটি সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলায়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে আরও আধুনিক করে তোলে; কিন্তু কিছু ঐতিহ্য মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে শিকড় গেড়ে থাকে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না; বরং নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আরও নতুন প্রাণ পায়। ‘সানসা ওদোরি’ ঠিক তেমনই একটি ঐতিহ্য। তাই ‘সানসা ওদোরি’ শুধু অতীতের একটি উৎসব নয়; এটি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য সেতু। ঢোলের প্রতিটি শব্দে যেন অতীতের গল্প শোনা যায়, নৃত্যের প্রতিটি পদক্ষেপে বর্তমানের আনন্দ ধরা পড়ে; আর শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসে দেখা যায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন। মোরিওকার গ্রীষ্মের সেই সন্ধ্যায় যখন শত শত মানুষ একই ছন্দে নাচে, ঢোল ও বাঁশির সুরে যখন পুরো শহর মুখর হয়ে ওঠে, তখন মনে হয়, এ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক গভীর হৃদয়ের বন্ধন। ‘সানসা ওদোরি’ তাই মোরিওকার একটি উৎসবের নাম নয়; এটি মোরিওকার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক জীবন্ত সংস্কৃতির নাম। লেখক পরিচিতি: অধ্যাপক সঞ্জয় সরকার, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রাণী গবেষণা সেন্টার, ইওয়াতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানে কর্মরত।

জাপানের মোরিওকা শহরের ঐতিহ্য ও আনন্দের উৎসব ‘সানসা ওদোরি’

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ঘোচাতে হবে

আমাদের শিশুরা কতটা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে, তার একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান প্রকাশ পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ থেকে ২০২৬—এই ছয় বছরে দেশে ৩ হাজার ৪৮৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ২ হাজার ৫৯৮ শিশুকে এবং পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আঘাত নিয়ে চরম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছে ১১ হাজার ৪৫৮ শিশু। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার কেউই শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, এর চেয়ে বড় অশনিসংকেত আর কী হতে পারে?  এইচআরএসএসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ছয় বছরে দেশে ঘটে যাওয়া মোট ৬ হাজার ১৫৩টি ধর্ষণের ঘটনার অর্ধেকের বেশি শিকার হয়েছে নিষ্পাপ শিশুরা। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্ষণের পর ১৩১ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ১ হাজার ২৫৫টি শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটি একটি করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবনের গল্প, একটি করে পরিবারের আজীবনের কান্না। আমাদের সংবিধানে এবং দেশে বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শিশুদের সুরক্ষায় নানা কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অপরাধীরা প্রায়ই আইনি ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক প্রভাব বা সামাজিক নীরবতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত শিশু নির্যাতনকারীদের দিনের পর দিন আরও বেপরোয়া করে তুলছে। শিশুদের ওপর এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা বন্ধে এখনই রাষ্ট্র ও সমাজকে কঠোর ও দৃশ্যমান ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তপ্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের অবহেলা বা আপসকামিতা বন্ধ করে যথাযথ চার্জশিট দাখিল নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পাড়া–মহল্লা পর্যায়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সচেতনতামূলক জোরদার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার যাতে কোনো ধরনের হুমকি বা চাপের মুখে না পড়ে, তার আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একটি দেশ কতটা সভ্য বা উন্নত, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারছে। আমরা যদি আমাদের শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ একটি সমাজ দিতে না পারি, তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়বে।  বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ গড়ে তোলা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় তাগিদ।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ঘোচাতে হবে
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream