ঢাকা    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
ইয়েমেনে হুতিবিরোধী অভিযান কি মুখ থুবড়ে পড়ছে?

ইয়েমেনে হুতিবিরোধী অভিযান কি মুখ থুবড়ে পড়ছে?

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী হুতিদের দখলে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারে ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান চালাচ্ছে। তবে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ দখল এবং সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এ অভিযানকে কঠিন করে তুলেছে। সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ আল-মাশিকের কাছে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। হামলার সময় ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি প্রাসাদে উপস্থিত থাকলেও তিনি অক্ষত ছিলেন। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তাদের অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটি সামরিক সদর দফতর। সৌদি আরব-সমর্থিত যোদ্ধা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সহায়তাকারী সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তায়েজের আশপাশে তাদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সরকারপন্থী বাহিনীর সরবরাহব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হুতিদের কাছ থেকে ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারই সরকারের ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় অভিযানের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারপন্থী যৌথ বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল ওয়াদাহ আল-দুবাইশ আল-জাজিরাকে বলেন, হুতিরা নিয়মিতভাবে সরকারি বাহিনীর সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। তবে এতে সরবরাহ বন্ধ হয়নি, ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও চলবে। তিনি বলেন, হামলার কারণে কোনও কোনও ফ্রন্টে সরঞ্জাম পৌঁছাতে দেরি হতে পারে কিংবা ব্যয় বাড়তে পারে। কিন্তু আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথ এখনও ব্যবহারযোগ্য থাকায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তায়েজ কার্যত অবরুদ্ধ সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তায়েজ শহরে। হুতিরা শহরটির সঙ্গে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এডেনের প্রধান সড়কটি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। পার্বত্য এলাকার বিকল্প পথগুলোও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক হুতি অগ্রযাত্রার পর তায়েজে জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে সেখানে পেট্রলের দাম তিন গুণ বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ হারানোয় সরকারি বাহিনীর কাছে গোলাবারুদ, অতিরিক্ত সেনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দর দখল করে হুতিরা। পশ্চিম তায়েজ অঞ্চলে সরকারপন্থী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র ছিল বন্দরটি। পরে পাল্টা অভিযানে কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে পারলেও মোখার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি সরকারি বাহিনী। ইয়েমেনের উপপ্রতিমন্ত্রী ফয়সাল আল-মাজিদি বলেন, বিচ্ছিন্ন ফ্রন্টগুলোর মধ্যে সরবরাহ সচল রাখতে সরকারপন্থী বাহিনী বিকেন্দ্রীকরণ ও বিকল্প রুট ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে। শাবওয়া, মারিব, তায়েজের হুতিমুক্ত এলাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে কেন্দ্র করে সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সুরক্ষিত রাখতে কৌশলগত উঁচু এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সৌদি সহায়তা ও সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান শুরুর পর ইয়েমেনের সরকার ও মিত্র বাহিনীর প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন বেড়েছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার বিষয়টিও স্বীকার করেছে রিয়াদ। আল-দুবাইশের মতে, ইরানের সরবরাহ করা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ উন্নত সামরিক সক্ষমতা এবং বিপুলসংখ্যক যোদ্ধার কারণে হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, অক্টোবরের শুরু থেকে চালানো বিমান হামলায় হুতিদের শত শত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অভিযান সফল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সরকারপন্থী বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা। ভিন্ন ভিন্ন কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত এসব বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো যায়নি বলে মনে করা হচ্ছে। জানুয়ারিতে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল সব হুতিবিরোধী সামরিক ইউনিটকে একক কমান্ডের আওতায় আনতে সুপ্রিম মিলিটারি কমিটি (এসএমসি) গঠন করে। তবে বাহিনীগুলোর অর্থায়ন ও নেতৃত্ব কাঠামোয় দীর্ঘদিনের পার্থক্য এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। ইয়েমেনের সামরিকবিষয়ক গবেষক আদনান আল-জাবারনি অবশ্য মনে করেন, বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ছে। তার মতে, হুতিরা সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারকে চাপে ফেলতে বেসামরিক স্থাপনা ও সরবরাহপথে হামলা চালালেও এতে হুতিবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হতে পারে। তবে তায়েজের অবরোধ ভাঙা, সরবরাহপথ পুনরুদ্ধার এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সরকারপন্থী বাহিনীর অগ্রযাত্রা ধরে রাখা কঠিন হবে। ফলে সৌদি সহায়তার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ই ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের সাফল্যের প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

ইরানের নিখুঁত হামলায় ভীষণ চাপে যুক্তরাষ্ট্র: রয়টার্স

উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক নিখুঁত হামলা চালিয়েছে ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।  এসব হামলায় তেল রফতানি, গ্যাস উৎপাদন, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানিশোধন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলও জটিল হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত সাতটি দেশে ৮৪টি অবকাঠামোগত স্থাপনায় কমপক্ষে ১৩৫টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলাগুলোর অনেকগুলোই ছিল নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো। এতে কিছু ক্ষেত্রে পুরো স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, আর কোথাও দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তেল ও গ্যাস স্থাপনায় বড় ক্ষতি ইরানের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর। হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত এই বন্দরটি ইরানের অবরোধ এড়িয়ে তেল রফতানির গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বন্দরটিতে অন্তত ১৯ বার হামলা হয়েছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। হামলায় তেল স্থানান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মে মাসের একটি ড্রোন হামলার পর পরিশোধিত জ্বালানি রফতানি প্রায় এক মাস বন্ধ ছিল। পরে কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হলেও বারবার হামলায় বন্দরটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। এতে গ্যাস তরল করার কাজে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শীতলীকরণ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতারএনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবির মতে, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রফতানির এই বিকল্প পথে সেপ্টেম্বরের এক হামলার পর অপরিশোধিত তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়ে। বিমানবন্দর, ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও লক্ষ্যবস্তু হামলা শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। কুয়েতের বিমানবন্দরে আটবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনের একটি স্থাপনায় হামলার ছয় মাস পরও সেবা পুরোপুরি চালু করা যায়নি বলে রয়টার্স জানিয়েছে। আবুধাবির এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়ামের আল তাওয়েলা কারখানায় হামলায় ১ হাজার ২৬২টি অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শেষ নাগাদ সেগুলোর মাত্র এক-চতুর্থাংশ চালু করা সম্ভব হয়েছিল। স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে। কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানিশোধন স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে। মরুভূমিপ্রধান দেশটি পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার স্থাপনাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে দেশটির আটটি যৌথ বিদ্যুৎ ও পানিশোধন স্থাপনার অন্তত চারটিতে হামলা হয়েছে। সৌদি আরবের তেল উৎপাদনে ধাক্কা সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের পাঁচটি এবং তিনটি বড় তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসের বেশির ভাগ সময় দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে ছিল। যুদ্ধের আগে উৎপাদন ছিল দৈনিক এক কোটির বেশি ব্যারেল। এতে বর্তমান দরে সৌদি আরবের ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব হারানোর হিসাব দিয়েছে রয়টার্স। দেশটির জাজান শোধনাগারেও জুলাইয়ের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত অন্তত চারবার হামলা হয়। হামলার পর শোধনাগারটির উৎপাদন শূন্যে নেমে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের নিখুঁত লক্ষ্যভেদ নিয়ে উদ্বেগ রয়টার্স ৩৬ জনের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট চিত্র, ভিডিও এবং সরকারি বিবৃতি বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানটি তৈরি করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর শিল্পবিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ১৪ জনের মূল্যায়ন ছিল, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতি কেবল আকাশ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়ে হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার অনেক ঘটনায় দাবি করেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূপাতিত ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি দেশে হামলার পরের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংবেদনশীল স্থাপনার নকশা ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা ধারণা করছেন। রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও মার্কিন কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন; তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। এই ধারাবাহিক হামলা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ফলে সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে, তা নতুন করে সামনে এসেছে। সূত্র: রয়টার্স

ইরানের নিখুঁত হামলায় ভীষণ চাপে যুক্তরাষ্ট্র: রয়টার্স

ইরানের হয়ে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, জার্মানিতে দু’জনের কারাদণ্ড

ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করার দায়ে দুই ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দিয়েছেন জার্মানির একটি আদালত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে তারা জার্মানিতে এসব হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। দণ্ডপ্রাপ্ত দু’জনের একজন ডেনমার্কের নাগরিক আলী এস। তাকে আট বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার সহযোগী আফগানিস্তানের এক নাগরিককে চার বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গুপ্তচরবৃত্তি ও হত্যাচেষ্টার দায়ে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। জার্মানির কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেনমার্কের নাগরিক আলী এস ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের নির্দেশে কাজ করতেন। তবে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এবং ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইরানের কথিত গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এ রায় এল। ইউরোপের একাধিক দেশ অভিযোগ করেছে, তাদের ভূখণ্ডে বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনার পেছনে তেহরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে ইরান অতীতেও এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর আগে চলতি মাসেই যুক্তরাজ্যে দুই ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডের ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ওই ঘটনাও ইউরোপে ইহুদি সম্প্রদায় ও ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জার্মানির এ রায় এমন এক সময়ে এল, যখন ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের কথিত গোয়েন্দা তৎপরতা ও সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং তেহরানের অস্বীকৃতি- দুই বিষয়ই কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

ইরানের হয়ে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, জার্মানিতে দু’জনের কারাদণ্ড

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের হাতে আর কী কী সামরিক বিকল্প আছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক শক্তি পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দুই দেশের সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও সামরিক উত্তেজনা কমার লক্ষণ নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সঙ্গে অচলাবস্থা ভাঙতে ট্রাম্পের হাতে সামরিক বিকল্প কী রয়েছে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের সম্ভাব্য মূল্য কতটা? কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে সামরিক বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে প্রধানত তিনটি পথ রয়েছে- ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও চাপ অব্যাহত রাখা, নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করা এবং সীমিত স্থল অভিযান চালানো। তবে প্রতিটি বিকল্পেরই রয়েছে উল্লেখযোগ্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি। যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে পরবর্তী মাসগুলোতে উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অন্তত ২০ শতাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। পরে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। গত বৃহস্পতিবার দাম ছিল প্রায় ১০৪ ডলার। জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ভেঙে পড়ে। এরপর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চললেও গত মাসে প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। যুক্তরাজ্যের লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা আফজাল আশরাফ আল-জাজিরাকে বলেন, সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের তুলনা চলে না। কিন্তু সেই বিপুল সক্ষমতা কাজে লাগিয়েও ওয়াশিংটন কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি। বিকল্প এক: নৌ অবরোধ ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত এ পথেই এগোনোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে নৌবাহিনীর পাহারা দিতে পারে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। এগুলোতে গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। মার্চে প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই চলাচল ভেঙে পড়ে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় সেপ্টেম্বরে ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহন যুদ্ধপূর্ব মাত্রার ৮১ শতাংশের বেশি হয়েছিল। তবে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর প্রণালি দিয়ে মাত্র ২৯ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা ওই মাসের সর্বনিম্ন। বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক বুরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে টহল ও নজরদারি বাড়িয়ে জাহাজগুলোকে কিছুটা নিরাপত্তা দিতে পারে। ড্রোনের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও হামলা চালানোয় ব্যয় তুলনামূলক কম হচ্ছে। তবে ইরানও কৌশল বদলেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে জাহাজে ১৫টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম খরচে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারছে তেহরান। বিকল্প দুই: নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা বাড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি ট্রাম্প। পরিস্থিতির অবনতি হলে ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও দেশের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত পরিসরে নতুন হামলা চালানো হতে পারে বলে মনে করেন প্যাট্রিক বুরি। তবে আগের হামলার তুলনায় এবার কম ফল পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আফজাল আশরাফের মতে, ইরান অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনলেও সেগুলো আরও ভালোভাবে আড়াল করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে এসেছে। ইরানের তুলনামূলক সস্তা একটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ লাখ ডলার বা তার বেশি দামের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বিরুদ্ধে এক হাজারের বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের মজুত পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে ২০৩০ সালের শেষ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য গোলাবারুদের মজুত আগের পর্যায়ে ফেরাতেও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন প্যাট্রিক বুরি। নতুন হামলা হলে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত মাসে ঘোষণা করেন, ‘সমানুপাতিক জবাবের’ যুগ শেষ হয়েছে। এছাড়া নতুন সংঘাতের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিকল্প তিন: খার্গ দ্বীপে সীমিত স্থল অভিযান ইরানের তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয় খার্গ দ্বীপ দিয়ে। দেশটির উপকূল থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প। সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডপ্রধান জোসেফ ভটেল বলেছেন, ৮০০ থেকে ১ হাজার সেনা দিয়ে দ্বীপটি দখল করা সম্ভব হতে পারে। তবে মূল ভূখণ্ড থেকে ইরানি বাহিনীর হামলার মুখে মার্কিন সেনারা অত্যন্ত ঝুঁকিতে পড়বেন। আশরাফের মতে, ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করতে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে অভিযান শুরু করা সম্ভব। কিন্তু দ্বীপ দখলের পর সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের হামলার ঝুঁকি থাকবে। পাল্টা হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে তেহরান। ইতোমধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে। এ কারণে খার্গ দ্বীপ দখলকে অত্যন্ত অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন আশরাফ। পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনা কম বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা আরও কম। ট্রাম্পও স্থলযুদ্ধের বিষয়টি অনেকটাই নাকচ করেছেন। মার্চে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, লক্ষ্য অর্জনে স্থলসেনার প্রয়োজন হবে না। প্যাট্রিক বুরির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এমন অভিযান চালানো বাস্তবসম্মত নয়। বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি স্থলযুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি ওয়াশিংটনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নির্বাচনের হিসাব ও আঞ্চলিক অস্থিরতা যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রায় ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তুষ্ট। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় নতুন সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক মূল্যও তাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদে শক্তি পুনরুদ্ধার করাও বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও তত বাড়বে। রবিবার ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পরিচালিত জাহাজ চলাচলের উদ্যোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতেই হামলা চালাচ্ছে তেহরান। তার ভাষায়, “আপনারা চোরাচালান করছেন, কিন্তু প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে।” তাই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামরিক চাপ বাড়ানোর একাধিক পথ থাকলেও কোনওটিই সহজ সমাধান দিচ্ছে না। নৌ অবরোধে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে, নতুন হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও চাপে পড়তে পারে, আর স্থল অভিযান ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি ও রাজনৈতিক সংকট। ফলে ট্রাম্পের জন্য সামরিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের হাতে আর কী কী সামরিক বিকল্প আছে?

হরমুজে ইরানের নতুন চাল, বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি রফতানি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আরব দেশগুলোর পরিচালিত একটি বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থাকে সরাসরি নিশানায় নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহযোগিতায় ছোট জাহাজ থেকে বড় তেলবাহী ট্যাংকারে জ্বালানি স্থানান্তরের যে ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেটি এখন তেহরানের লক্ষ্যবস্তু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ায় তেহরানও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে সামরিক ও কূটনৈতিক- দুই পথেই যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার কথা বলছে ইরান। রবিবার রাতে দেওয়া বক্তব্যে রেজাই দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ছোট জাহাজ ব্যবহার করে তেল বড় ট্যাংকারে স্থানান্তর করছে। তার অভিযোগ, কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতেই এই ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজে হামলা চালাচ্ছে ইরান। রেজাই বলেন, “আপনারা চোরাচালান করছেন। কিন্তু প্রণালিটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে, আর আমরাই এটি পরিচালনা করি।” তার এই বক্তব্যকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রফতানি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছানোর দাবি করেছেন ট্রাম্প। ইরানের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, বিকল্প পথে তেল পরিবহন যতই বাড়ুক, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে সরে আসতে রাজি নয় তেহরান। ওমানের উপকূল ঘেঁষে বিকল্প তেল পরিবহন যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর ইরানের পাল্টা হামলায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি চালু রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এতে অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) এবং অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজ সমন্বিতভাবে কাজ করে। আরব দেশগুলোর বন্দর থেকে তেল নিয়ে জাহাজগুলো ওমানের উপকূল ঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। পরে ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হয়। এভাবে বড় ট্যাংকারে তেল তুলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। কিছু ছোট জাহাজ আবার উপসাগরে ফিরে গিয়ে নতুন করে তেল সংগ্রহ করে। হামলার ঝুঁকি কমাতে এসব জাহাজের অনেকগুলো স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণব্যবস্থা বা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে এবং রাতের অন্ধকারে চলাচল করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এতে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা এবং চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। রবিবার রাত থেকে সোমবারের মধ্যে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি ছেড়ে যাওয়া দুটি ট্যাংকার এবং ওমানের বন্দরনগরী সোহারসংলগ্ন নোঙর এলাকায় থাকা আরেকটি জাহাজ রয়েছে। সোহার এলাকায় জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত সপ্তাহেও কয়েকটি জাহাজ লক্ষ্য করে প্রক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। এতে ইঙ্গিত মিলছে, হামলা কেবল হরমুজ প্রণালির ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; বিকল্প দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অবরোধ অব্যাহত থাকলে হামলাও চলবে ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখলে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলও নিরাপদ থাকবে না। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর তেল রফতানির প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে তেহরান আরও সক্রিয় হয়েছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম ভাগেই অন্তত ১৫টি জাহাজ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উইন্ডওয়ার্ডের লন্ডনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সামুদ্রিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক মিশেল উইজ বকম্যানের মতে, বিকল্প পরিবহনপথটি যত বেশি কার্যকর হচ্ছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা ততই কমছে। এ কারণেই দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর হামলা বাড়ছে বলে তার ধারণা। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়ে জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। বকম্যানের ভাষ্য, ওমান এই আইনি কাঠামোর আওতায় জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা দিয়ে সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে ভূমিকা রেখেছে। তবে বিকল্প পথ চালু থাকলেও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে। ইরান যদি নিয়মিত হামলা চালায়, তাহলে জ্বালানি পরিবহনের সময়, ব্যয় ও ঝুঁকি- সবই বাড়তে পারে। মাইন আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা? হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন থাকার আশঙ্কাকেও সামনে আনছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালির বিভিন্ন স্থানে মাইন পেতে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করে জাহাজ চলাচল করলে গুরুতর বিপদের মুখে পড়তে পারে- এমন বার্তা দিচ্ছে আইআরজিসি। বাহিনীটির দাবি, সপ্তাহান্তে মাইনের আঘাতে তিনটি ট্যাংকারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া মাইনের আঘাতে একটি জাহাজে আগুন ধরে যাওয়ার দৃশ্যও প্রকাশ করেছে তারা। তবে প্রকাশিত ভিডিওতে মাইন বিস্ফোরণের দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। এ ধরনের দাবির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজগুলোর ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইরানের আইআরজিসি কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দর এবং নোঙর এলাকায় থাকা ট্যাংকারগুলোকে হুমকি দিয়েছিল। ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওই হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেছিল বাহিনীটি। একই সঙ্গে দেশ দুটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থানের সুযোগ দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগ তোলে তেহরান। সৌদি আরবকেও জড়াল তেহরান রেজাইয়ের বক্তব্যে সৌদি আরবের নামও এসেছে। ইরানের বিধিনিষেধ এড়িয়ে তেল পরিবহনে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে সৌদি রাজধানী রিয়াদে সরাসরি হামলার হুমকি দেননি। এমন সময় এই অভিযোগ এল, যখন ইয়েমেনের ইরানঘনিষ্ঠ হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে সৌদি আরব। ফলে হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক উত্তেজনা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশকেও আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে। রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ কেবল, তথ্যকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হরমুজ প্রণালির আশপাশের এলাকায় এসব স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি। এতে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাড়বে অর্থনৈতিক চাপ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরতে পারেনি, উইন্ডওয়ার্ডের পরিসংখ্যানেও তার প্রতিফলন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৩১টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধের আগে এই সংখ্যা ছিল ১৩৮। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ইরানের লক্ষ্যবস্তু হওয়া ৪৫টি জাহাজের ৮৭ শতাংশই ছিল ট্যাংকার। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জাতীয় জ্বালানি কোম্পানির জাহাজ। হামলার ৯৩ শতাংশ ঘটেছে হরমুজ প্রণালিতে। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হামলার শিকার হয়েছে বলে উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাহাজভাড়া ব্যাপকভাবে বেড়েছে। উইন্ডওয়ার্ডের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে উপসাগরীয় অঞ্চলের অপরিশোধিত তেলের মোট ব্যয়ের মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ ছিল পরিবহন খরচ। এখন তা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোকে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সরকারি বা আনুষ্ঠানিক বিক্রয়মূল্যের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ৩৫ ডলার পর্যন্ত ছাড় দিতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যয়বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ পথে তেল পরিবহনে রাজি এমন ট্যাংকারের সংকট। উইন্ডওয়ার্ডের হিসাবে, বিশ্বের অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অদক্ষ ও জটিল পরিবহনব্যবস্থায় আটকে রয়েছে। ছোট জাহাজ থেকে বড় ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর, বন্দরে ও নোঙর এলাকায় হামলার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এ ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বকম্যানের ভাষায়, এর প্রভাব এক ধরনের ধারাবাহিক সংকট তৈরি করছে- যা বিভিন্ন শ্রেণির জাহাজের পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা ইরানের দাবি, যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের দেওয়া সাতটি শর্তের কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। তবে সব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও চুক্তি হবে না বলে স্পষ্ট করেছে ইরান। আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারছে- এমন মূল্যায়ন থেকেই তেহরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য তাদের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিশ্লেষণে আজিজি প্রশ্ন তুলেছেন, সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য ইরানের ওপরও ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এই চাপ দীর্ঘদিন ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে তেহরান অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ছে কি না। তাই বলা যায়- বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও হামলার ঝুঁকি, বাড়তি জাহাজভাড়া এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা কাটতে দিচ্ছে না। হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রফতানিতে নয়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপরও পড়তে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

হরমুজে ইরানের নতুন চাল, বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো

যুদ্ধের আগের তুলনায় বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ এখনও অনেক কম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তেল শিল্প ও বাজার বিভাগের সাবেক প্রধান নিল অ্যাটকিনসন বলেছেন, জি-৭ দেশগুলোর জ্বালানি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত স্বাগত জানানোর মতো হলেও এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের মূল সংকটের সমাধান হচ্ছে না। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অ্যাটকিনসন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর সাত মাস পরও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের তুলনায় ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কম’ রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সংকটের মূল মনোযোগ গিয়ে পড়েছে জ্বালানির চূড়ান্ত ব্যবহার পর্যায়ে, বিশেষ করে ডিজেলের ওপর। কারণ ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়াই এখন বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। ডিজেল সরবরাহ কমার তিন কারণ অ্যাটকিনসনের মতে, বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে আগের মতো ডিজেল যাচ্ছে না। ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও কুয়েত থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানি করে আসছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের কারণে সেই সরবরাহ এখন কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া এখন ডিজেল রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন ও রফতানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অ্যাটকিনসন বলেন, ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারগুলোতে হামলার কারণে রাশিয়া এখন আর ডিজেল রফতানি করছে না। তৃতীয়ত, চীনও ডিজেল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে আগে যেসব বড় সরবরাহকারী দেশ থেকে ডিজেল পাওয়া যেত, তাদের কয়েকটি এখন বাজারে আগের মতো জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না। চাহিদা কমছে না, বরং বাড়তে পারে সরবরাহ কমে গেলেও ডিজেলের বৈশ্বিক চাহিদা তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। ফলে বাজারে ঘাটতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অ্যাটকিনসনের মতে, কৃষিপণ্যের ফসল কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। কৃষিকাজে ট্রাক্টর, হারভেস্টার, পাম্প, পরিবহনসহ বিভিন্ন যন্ত্রে ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফলে এ সময় জ্বালানিটির চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি থাকে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে এবং কৃষিপণ্যের ফসল কাটার মৌসুমের কারণে এই চাহিদা উচ্চ পর্যায়েই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জি-৭’র মজুত ছাড়েও কাটছে না সংকট বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে জি-৭ দেশগুলোর কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অ্যাটকিনসন। তবে তার মতে, এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে বাজারে স্বস্তি দিতে পারলেও বৈশ্বিক সরবরাহ ঘাটতির মৌলিক সমস্যার সমাধান করবে না। কারণ, একদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে ডিজেলের সরবরাহ কমেছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীরাও বিশ্ববাজারে আগের মাত্রায় ডিজেল দিচ্ছে না। একই সময়ে কৃষি মৌসুমকে কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ছে। ফলে যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থা পুনরুদ্ধার না হলে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সংকট সহজে কাটবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ ঘাটতি অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানির দামে নয়, পরিবহন ব্যয় ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্যেও পড়তে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা বিডি প্রতিদিন/একেএ

যুদ্ধের আগের তুলনায় বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ এখনও অনেক কম
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream