৫২ বছরে বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে ৭৩ শতাংশ
পৃথিবীর বন্যপ্রাণী ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। গত ৫২ বছরে বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষণ করা বন্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর জনসংখ্যার গড় আকার কমেছে ৭৩ শতাংশ। নতুন এক প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত শিকার ও আহরণ, দূষণসহ নানা মানবসৃষ্ট চাপের কারণে প্রকৃতির ওপর এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ)। প্রকাশিত ডব্লিউডব্লিউএফের লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট ২০২৬-এ ১৯৭০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণীর সংখ্যা পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৭৯০ প্রজাতির ৩৫ হাজার ৮০৩টি জনসংখ্যার প্রবণতা। এসবের মধ্যে স্তন্যপায়ী, পাখি, মাছ, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী রয়েছে।
তবে প্রতিবেদনের ৭৩ শতাংশের পরিসংখ্যানটি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর মোট ৭৩ শতাংশ বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বরং ১৯৭০ সালের তুলনায় পর্যবেক্ষণ করা প্রাণীগুলোর জনসংখ্যার গড় আকার ৭৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ অনেক প্রাণীর পাল, ঝাঁক বা বিচরণকারী গোষ্ঠী আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়েছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্রে- ৮৫ শতাংশ। স্থলভাগের প্রাণীর ক্ষেত্রে গড় পতন ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষেত্রে ৫৯ শতাংশ। অঞ্চলভেদে সবচেয়ে বড় সংকট লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে, যেখানে পর্যবেক্ষণ করা বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যার গড় আকার ৯৫ শতাংশ কমেছে। আফ্রিকায় এই পতন ৮০ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪৯ শতাংশ।
বন্যপ্রাণীর এই পতনের সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণ আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়। এর পর রয়েছে অতিরিক্ত আহরণ বা শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার এবং বিভিন্ন রোগ। এসব চাপ আবার খাদ্য উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবহার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে নদী ও হ্রদ। মিঠাপানির প্রাণীদের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। নদী দখল, দূষণ, বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব বাস্তুতন্ত্রে প্রাণীর সংখ্যা কমছে। মিঠাপানির প্রাণীদের জনসংখ্যায় ৮৫ শতাংশ পতন এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে।
তবে প্রতিবেদনটি শুধু সংকটের চিত্রই দেয়নি; কিছুটা আশার কথাও জানিয়েছে। পর্যবেক্ষণ করা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হয় স্থিতিশীল রয়েছে, নয়তো বেড়েছে- প্রায় ৭ শতাংশ স্থিতিশীল এবং ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ যথাযথ সংরক্ষণ, আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে বন্যপ্রাণীর জনসংখ্যা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
বাঘ, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ, দক্ষিণ আফ্রিকার হাতি এবং আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের ব্লুফিন টুনার কিছু জনসংখ্যার পুনরুদ্ধারকে প্রতিবেদনে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার ব্যবস্থা ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
তবে সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো, কেবল কয়েকটি প্রজাতিকে রক্ষা করলেই সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য সংকট কাটবে না। যে খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে প্রকৃতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, সেসব ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। ডব্লিউডব্লিউএফ বলছে, প্রকৃতির ক্ষতি থামাতে হলে এসব খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি দ্রুত ও ব্যাপক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জেডএসএলের বিজ্ঞানীদের তৈরি লিভিং প্ল্যানেট ইনডেক্স-এর এই তথ্য মূলত পৃথিবীর বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যের একটি সতর্ক সংকেত। গবেষকদের মতে, প্রকৃতি যে ক্ষতির মুখে পড়েছে তা গুরুতর হলেও এই পতন অনিবার্য নয়। যেসব ক্ষেত্রে মানুষের হস্তক্ষেপে প্রাণীর সংখ্যা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সেগুলো দেখাচ্ছে- সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রকৃতিও পুনরুদ্ধার করতে পারে।
কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরাগায়ন, পানি, খাদ্য, মাটি ও জলবায়ুর ভারসাম্যের মতো মানুষের জীবনধারণের মৌলিক ভিত্তিগুলোও। ফলে ৭৩ শতাংশের এই হিসাব শুধু বন্যপ্রাণীর সংকট নয়; এটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তাও।
তথ্য সূত্র- রয়টার্স।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ