ঢাকা    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
ট্রাংক কেটে প্রশ্নপত্র চুরি, কর্মকর্তার কক্ষেই ফটোকপি করে ছড়াত চক্র

ট্রাংক কেটে প্রশ্নপত্র চুরি, কর্মকর্তার কক্ষেই ফটোকপি করে ছড়াত চক্র

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সরকারি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বিজি প্রেসের কয়েকজন কর্মীর সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।সিআইডির তদন্ত নথি অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র চুরি করার পর সেগুলো ফটোকপি, কম্পোজ ও বিভিন্ন মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। বিনিময়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হতো বিপুল অর্থ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এ ঘটনায় ৫৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে সিআইডি। তাঁদের মধ্যে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের পৃথক অনুসন্ধান চলছে।কর্মকর্তার কক্ষেই ফটোকপি করা হয় প্রশ্নতদন্তে প্রশ্নপত্র চুরির একটি ঘটনা উঠে এসেছে পিএসসির অফিস সহায়ক মো. সাজেদুল ইসলামকে ঘিরে। তদন্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র চুরির পরিকল্পনায় তাঁর ভূমিকা ছিল।অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পিএসসির এক কর্মকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাজেদুল চাবি সংগ্রহ করে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করেন। পরে হ্যাকসো ব্লেড দিয়ে একটি ট্রাংকের তালা কেটে ফাইনাল মডারেশনের চার সেট হাতে লেখা প্রশ্নপত্র বের করেন।প্রশ্নপত্র বাইরে নেওয়ার পরিবর্তে ওই কক্ষের অফিসিয়াল ফটোকপি মেশিনেই চার সেট প্রশ্নের কপি করা হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর মূল প্রশ্নপত্রগুলো আবার ট্রাংকের ভেতরে রেখে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।৮০০ প্রশ্ন পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগসিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, চুরি করা চার সেট প্রশ্নপত্র বিভিন্ন জায়গায় ভাগ করে কম্পোজ করানো হয়। রেলওয়ের ওই চার সেটে মোট ৮০০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন ছিল।তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, পরীক্ষার দুই দিন আগে ঢাকার রমনা পার্কের কাছে এসব প্রশ্ন সৈয়দ আবেদ আলীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে সাজেদুল ৭৫ লাখ টাকা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।বিজি প্রেস থেকেও প্রশ্নপত্র পাচারের অভিযোগতদন্তে সরকারি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বিজি প্রেসের কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধেও প্রশ্নপত্র বাইরে পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।সিআইডির তদন্ত নথি অনুযায়ী, বিজি প্রেসের বাঁধাইকর্মী মোহাম্মদ আকরাম হোসেন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মজনু মিয়া নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে প্রশ্নপত্র বাইরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।তদন্তে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র প্যাকেট করার সময় কৌশলে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে মুঠোফোনে প্রশ্নের ছবি তোলা হতো। আবার কখনো প্রশ্নপত্র শরীরে লুকিয়ে বাইরে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের তথ্যসিআইডির উদ্ধার করা খুদে বার্তা ও হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনে বিসিএস, পিএসসির নন-ক্যাডারসহ বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং চাকরি দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।কিছু বার্তায় পরীক্ষায় পাস করানো, ভাইভায় উত্তীর্ণ করানো এবং চাকরি দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ চাওয়ার কথাও উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের অস্তিত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রআদালত সূত্রের বরাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৮ মে ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে সিআইডি। তাঁদের মধ্যে ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং সৈয়দ আবেদ আলী, তাঁর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামসহ ২৫ জন জামিনে আছেন। বাকি ২৯ জন পলাতক বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে।অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে সিআইডি।আগেও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ছিল খলিলুরের বিরুদ্ধেমামলার অন্যতম আসামি মো. খলিলুর রহমান ২০০৫ সাল থেকে পিএসসিতে ডেসপাচ রাইটার হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১২ সালে ৩৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার ও চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।পরে তিনি আবার চাকরিতে ফিরে আসেন বলে তদন্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে পরীক্ষার প্রবেশপত্র, প্রশ্নপত্র, চেক, স্ট্যাম্প, একটি ডায়েরি ও নোট খাতা উদ্ধার করা হয় বলে সিআইডি জানিয়েছে।আবেদ আলীর ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যতদন্তে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, তাঁর নিজের ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১২টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার লেনদেন বা অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষায় ৪৪ জন প্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম নেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।আরও কয়েকটি পরীক্ষায় নেটওয়ার্কের বিস্তারের তথ্যসিআইডির তদন্তে বিসিএস, রেলওয়ে, কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষক নিবন্ধন, মেডিকেলসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ ও অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।তদন্তকারীদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শুধু বাইরের দালাল বা চাকরিপ্রার্থীদের নয়, প্রশ্নপত্র তৈরি, সংরক্ষণ ও মুদ্রণের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একাধিক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তথ্য উঠে এসেছে।আদালতের প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে অভিযোগের সত্যতামামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া আদালতে চলবে। অভিযোগপত্রে থাকা তথ্য ও তদন্তে পাওয়া উপাদান আদালতে যাচাই করা হবে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream