ঢাকা    সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
‘পশ্চিমা সভ্যতা’ নিয়ে বিপজ্জনক ভাবনা ছড়াচ্ছেন মার্কো রুবিও!

‘পশ্চিমা সভ্যতা’ নিয়ে বিপজ্জনক ভাবনা ছড়াচ্ছেন মার্কো রুবিও!

পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে অতীতের অনুসন্ধান, বিজয় ও সম্প্রসারণের মানসিকতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার মতে, পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের ঐতিহাসিক মূল্যবোধ নতুন করে ধারণ করতে না পারলে একসময় পতনের মুখে পড়তে পারে এবং বিশ্বে প্রাসঙ্গিকতা হারাতে পারে। তবে তার এ বক্তব্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে সমালোচনা করেছেন লেখক টেড উইডমার। ৭ অক্টোবর গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে প্রাচীন অ্যাক্রোপলিসের পটভূমিতে দেওয়া এক ভাষণে রুবিও পশ্চিমা সভ্যতার অতীত গৌরব ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন। সূর্যাস্তের সোনালি আলোয় পার্থেনন মন্দিরকে পেছনে রেখে দেওয়া এ ভাষণে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। টেড উইডমারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রুবিওর বক্তব্যে গণতন্ত্রের ঐতিহ্যের চেয়ে অনুসন্ধান, বিজয়, সম্প্রসারণ এবং শক্তিমান ব্যক্তিদের নেতৃত্বের ধারণা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তার ভাষণে পশ্চিমা সভ্যতার অবক্ষয় নিয়ে এমন আক্ষেপ ফুটে উঠেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল চিন্তাধারার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আলোচনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গণতন্ত্রের ঐতিহ্য বনাম বিজয়ের ধারণা রুবিওর বক্তব্যের সমালোচনা করে উইডমার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সাহিত্য ও দর্শন থেকে গভীরভাবে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। তবে তাদের লক্ষ্য ছিল সমান অধিকারসম্পন্ন মানুষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, অন্য জাতি ও জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অন্যতম রচয়িতা টমাস জেফারসন রোমান দার্শনিক সিসেরোর চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। সিসেরোর দর্শনে একই প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের সমান অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিডের কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। ইউক্লিডের গাণিতিক যুক্তি ও সমতার ধারণা লিংকনের চিন্তায় প্রভাব ফেলেছিল বলে উল্লেখ করেছেন  টেড উইডমার। তার মতে, এসব ঐতিহাসিক উদাহরণ দেখায়, প্রাচীন সভ্যতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য কেবল শক্তি ও বিজয়ের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা ছিল না; বরং স্বাধীনতা, যুক্তি ও সমতার ধারণাকেও তারা গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ বলতে কী বোঝায় টেড উইডমার তার বিশ্লেষণে প্রশ্ন তুলেছেন, পশ্চিমা সভ্যতার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা কী। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের উত্তরাধিকারকে পশ্চিমা পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলে রাশিয়ার মতো দেশকে সেই পরিসরের বাইরে রাখা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রুশ ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও প্রাচীন গ্রিস ও রোমের ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে, জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারও প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সভ্যতার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে তার এ আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছিল। নিজের বই মাইন কাম্ফ-এও তিনি প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা ও পারস্য যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘উচ্চতর সংস্কৃতি’র প্রশংসা করেছিলেন। টেড উইডমারের যুক্তি, প্রাচীন সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধা কিংবা সেই সভ্যতার ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলেই কোনও রাজনৈতিক আদর্শের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিশ্চিত হয় না। বরং ইতিহাসের এসব উপাদানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বের অবদানও পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশে অন্যান্য অঞ্চলের অবদানও তুলে ধরেছেন উইডমার। তার মতে, প্রাচীন গ্রিস ও রোমের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেনি। এর পেছনে পূর্বাঞ্চলীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। বর্তমান ইরাকের ভূখণ্ডে অবস্থিত প্রাচীন সুমের সভ্যতায় লেখার প্রাচীনতম ব্যবস্থাগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। একইভাবে, গণিত ও বিজ্ঞানের বহু ধারণা বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। প্রাচীন গ্রিক ও পারসিকদের মধ্যে যুদ্ধ থাকলেও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছিল। টেড উইডমারের মতে, পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসকে কেবল ইউরোপীয় বিজয় ও সম্প্রসারণের ইতিহাস হিসেবে দেখলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশে অন্যান্য অঞ্চলের অবদান আড়ালে পড়ে যায়। ইরান যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে ভাষণের বৈপরীত্য রুবিও তার ভাষণে প্রাচীন গ্রিক যোদ্ধাদের একটি ছোট দলের বীরত্বের কাহিনি তুলে ধরেন, যারা পারসিক আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে অ্যাক্রোপলিস রক্ষায় লড়েছিল। কিন্তু টেড উইডমারের মতে, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বীরত্বগাথা তুলে ধরার মধ্যে একধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। তার নিবন্ধে যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিস্থিতি, বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সান ডিয়েগোতে ফিরে যাওয়া, ইংল্যান্ডের একটি ঘাঁটি থেকে ১২টি বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়া এবং জাহাজ চলাচলে ইরানের হামলা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ এসেছে। একই সঙ্গে তেলের উচ্চমূল্যের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তিনি।  টেড উইডমারের মতে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, জুলিয়াস সিজার, শার্লেমেন ও এরনান কোর্তেসের মতো ঐতিহাসিক বিজেতাদের উদাহরণ দিয়ে শক্তি ও সম্প্রসারণের আদর্শ তুলে ধরা হলেও বর্তমান যুদ্ধের বাস্তবতা সেই আদর্শের সীমাবদ্ধতা সামনে আনছে। ‘মহান ব্যক্তি’ ও সাম্রাজ্যের পতনের ধারণা রুবিওর ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে টেড উইডমার চিহ্নিত করেছেন ইতিহাসে ‘মহান ব্যক্তিদের’ ভূমিকার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা। তার মতে, রুবিওর বক্তব্যে এমন ধারণা ফুটে উঠেছে যে ইতিহাস নির্ধারিত হয় সেই নেতাদের হাতে, যারা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করেন এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করেন। রুবিওর ভাষণে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নতুন কিছু আবিষ্কার, ঝুঁকি গ্রহণ ও গৌরব অর্জনের আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। টেড উইডমারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের বক্তব্য কখনও কখনও ভিডিও গেমের কাহিনির মতো মনে হয়, যেখানে শক্তিশালী চরিত্ররা নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের জন্য প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। টেড তবে উইডমার স্বীকার করেছেন, ইতিহাসে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন, জাতীয় সাফল্য অর্জন এবং সাম্রাজ্যের পতন এড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারাও গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। মার্কিন প্রতিষ্ঠাতা জন অ্যাডামস একবার লিখেছিলেন, “এখন পর্যন্ত এমন কোনও গণতন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না, যা আত্মহত্যা করেনি।” অর্থাৎ, গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই তার পতনের কারণ তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কা তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছিল। অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের বক্তব্যও ছিল ভিন্ন মাত্রার ১৯১০ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট তার বিখ্যাত ‘ম্যান ইন দ্য অ্যারেনা’ বক্তব্যে এমন মানুষের প্রশংসা করেছিলেন, যিনি ব্যর্থতা ও ভুলের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সাহসের সঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যান। তার বক্তব্যে সাফল্যের পাশাপাশি চেষ্টা, অধ্যবসায় ও ব্যর্থতা থেকে শেখার গুরুত্বও ছিল। একইভাবে, ১৯৬১ সালে অভিষেক ভাষণে জন এফ. কেনেডি স্বাধীনতা রক্ষায় যেকোনও মূল্য দিতে, যেকোনও বোঝা বহন করতে এবং যেকোনও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির কথা বলেছিলেন। টেড উইডমারের বিশ্লেষণে এসব বক্তব্যের সঙ্গে রুবিওর ভাষণের কিছু সাদৃশ্য থাকলেও মূল প্রশ্নটি থেকে যায়- পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ কি সামরিক শক্তি, বিজয় ও আধিপত্যের আদর্শ পুনরুজ্জীবিত করার ওপর নির্ভরশীল, নাকি সমতা, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করার ওপর? রুবিওর ভাষণকে ঘিরে এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে পশ্চিমা সভ্যতার পরিচয়, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream