একা বিদেশযাত্রায় নারীদের ইমিগ্রেশনে এত প্রশ্ন কেন?
একা বিদেশযাত্রায় নারীদের ইমিগ্রেশনে এত প্রশ্ন কেন?প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি ও বিমানের টিকিট নিয়ে বিদেশে যেতে চাইলে ইমিগ্রেশনে তাঁর ভ্রমণের উদ্দেশ্য, নথিপত্র ও গন্তব্য নিয়ে যাচাই হওয়া স্বাভাবিক। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় অবিবাহিত হওয়া, পরিবারের সম্মতি আছে কি না এবং অভিভাবক ছাড়া কেন বিদেশে যাচ্ছেন—এ ধরনের প্রশ্ন তোলার অভিযোগ সামনে এসেছে।নেপাল যাওয়ার পথে তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে আটকে দেওয়ার ঘটনায় হাইকোর্ট রুল জারি করার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আদালত জানতে চেয়েছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা অনুরূপ লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিদেশযাত্রা বাধাগ্রস্ত না করতে নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়েও রুল জারি করা হয়েছে।নেপাল যাওয়ার পথে তিন নারীকে বাধারিট আবেদনকারী রিফা তামান্না, সোহানি ইসলাম সমাপ্তি ও নাজনীন গত ৮ আগস্ট নেপালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। তাঁদের নেপালে একটি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল বলে তাঁদের আইনজীবী জানিয়েছেন। তিনজনই বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটির (BIMS) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।রিটে তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তিনজনই প্রাপ্তবয়স্ক এবং তাঁদের কাছে বৈধ পাসপোর্ট, নেপালে প্রবেশের প্রয়োজনীয় অনুমতি ও বিমানের টিকিট ছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা বিদেশযাত্রায় আইনগত প্রতিবন্ধকতাও ছিল না।তাঁদের অভিযোগ, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁদের বৈবাহিক অবস্থা, পরিবারের সদস্যরা ভ্রমণের বিষয়টি জানেন কি না এবং অভিভাবক ছাড়া কেন বিদেশ যাচ্ছেন—এসব বিষয়ে প্রশ্ন করেন। এরপর প্রয়োজনীয় নথি থাকার পরও তাঁদের নেপাল যেতে দেওয়া হয়নি।ঘটনার পর তাঁরা পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাঁরা হাইকোর্টে রিট করেন।হাইকোর্টের রুল ও নির্দেশনা২৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটির প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারি করেন।আদালত জানতে চান, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তিন নারীর বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের শুধু অবিবাহিত হওয়া, বাবা-মা বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ কিংবা এ ধরনের লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বিদেশযাত্রা থেকে বিরত না রাখতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রণয়ন ও জারির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছে।এ ছাড়া তিন নারীর করা অভিযোগ সাত দিনের মধ্যে তদন্ত করে নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ বিষয়ে আদালতে কমপ্লায়েন্স রিপোর্টও দাখিল করতে বলা হয়েছে।ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র থাকলে ওই তিন নারীকে আইনগত ভিত্তি ছাড়া বিদেশযাত্রায় বাধা না দেওয়ার জন্যও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।মানব পাচার ঠেকানোর যুক্তিইমিগ্রেশন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি শুধু নারীদের বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; মানব পাচার প্রতিরোধের বিষয়টিও বিমানবন্দরে যাত্রী যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের ক্ষেত্রে নেপালকে একটি রুট হিসেবে ব্যবহার করার আশঙ্কা থাকায় নেপালগামী যাত্রীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই করা হয়। বিশেষ করে ভ্রমণের উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয় নথি ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে কর্মকর্তারা অতিরিক্ত প্রশ্ন করতে পারেন বলে তাঁদের বক্তব্য।নেপাল বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কাঠমান্ডুসহ নির্ধারিত প্রবেশপথে ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধা দেয়। একই সঙ্গে নেপালের দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকরা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন বা eTA-ও নিতে পারেন।তবে তিন নারীর ঘটনায় ঠিক কোন নির্দিষ্ট আইনগত কারণে তাঁদের আটকে দেওয়া হয়েছিল, তা এখন আদালতের বিচারাধীন বিষয়।শুধু নেপাল নয়, অন্য নারীদেরও একই অভিজ্ঞতার অভিযোগএই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ প্রতিবেদনে একা বা নারী সহকর্মীদের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণের সময় অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে।নারী অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী তাঁর একটি পুরোনো অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, একটি কর্মশালায় অংশ নিতে পাঁচ নারী নেপাল যাচ্ছিলেন। প্রয়োজনীয় নথি থাকার পরও তাঁদের একজনকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাঁর স্বামী এই বিদেশযাত্রার বিষয়ে জানেন কি না—তা জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। এমনকি স্বামীর ফোন নম্বর নিয়ে কর্মকর্তারা ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন বলেও তাঁর বক্তব্য।আরেকাধিক নারী ভ্রমণকারীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের ইমিগ্রেশন অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। এসব বর্ণনায় কখনো বৈবাহিক অবস্থা, কখনো পরিবারের সম্মতি, আবার কখনো বিদেশে কোথায় থাকবেন—এ ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্নের কথা উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।আইনগত প্রশ্ন কোথায়?এই ঘটনায় মূল প্রশ্নটি শুধু ইমিগ্রেশনে প্রশ্ন করা যাবে কি না—তা নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বৈধ বিদেশযাত্রা বন্ধ করার জন্য কী ধরনের আইনগত ভিত্তি প্রয়োজন এবং সেই ভিত্তি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে।নিরাপত্তা, মানব পাচার প্রতিরোধ বা অন্য কোনো অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের যাচাই করার ক্ষমতা থাকতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির বিদেশযাত্রা বন্ধ করে দিলে তার পেছনে নির্দিষ্ট আইনগত কারণ ও কর্তৃত্ব থাকা প্রয়োজন কি না—এই বিষয়টিই এখন হাইকোর্টের বিবেচনায় এসেছে।তিন নারীর পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান আদালতে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় নথি থাকার পরও নারীদের বৈবাহিক অবস্থা বা অভিভাবক সঙ্গে আছেন কি না—এসব বিষয়কে বিদেশযাত্রা আটকে দেওয়ার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা নাগরিক অধিকার ও সমতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।সামনে আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে নজরতিন নারীকে নেপাল যেতে বাধা দেওয়ার ঘটনা এখন আদালতের আইনি পর্যালোচনায় রয়েছে। হাইকোর্ট একদিকে তাঁদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যতে আইনগত ভিত্তি ছাড়া তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।ফলে ইমিগ্রেশনে নারী যাত্রীদের যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মানব পাচার প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণের অধিকারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে—তা নিয়ে পরবর্তী আদালতীয় নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত তিন নারীর বিদেশযাত্রা আটকে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট আইনগত কারণ কী ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।