ঢাকা    সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
 জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন: শশী থারুর

জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন: শশী থারুর

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক দেশটির নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। জনবিক্ষোভ, সংসদীয় বিরোধ, জোট রাজনীতি এবং আদালতে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা ও তিরুঅনন্তপুরমের সংসদ সদস্য শশী থারুরের সাম্প্রতিক এক মতামতধর্মী নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে চলমান বিতর্ক শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের কার্যক্রমের প্রশ্ন নয়; এটি নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও স্বাধীনতার কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।রাজপথে বিরোধীদের আন্দোলনজ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করছে। কংগ্রেসসহ বিরোধীরা বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে।সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে বিরোধীদের মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশ কয়েকজন বিরোধী নেতাকে আটক করে। কংগ্রেসের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। অন্যদিকে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এসব রাজনৈতিক অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।থারুরের নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, কংগ্রেস চলতি সপ্তাহে সিইসির বিরুদ্ধে প্রায় ৯৩০টি প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছে। বিরোধী নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তুলেছেন।সিইসিকে অপসারণের প্রক্রিয়া কঠিনপ্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। থারুর তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, এই প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয়।২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act অনুযায়ী, কোনো কমিশনার নিজে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ করতে পারেন। তবে তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অপসারণ করতে হলে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং দুই কক্ষেই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হয়। ফলে সরকারের সমর্থন ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা কঠিন।সুপ্রিম কোর্টে গড়িয়েছে বিতর্কজ্ঞানেশ কুমারের কার্যক্রম এবং এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও একাধিক আবেদন হয়েছে।এর মধ্যে একটি আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও ঐকমত্য ছাড়াই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং ভোটার নিবন্ধন-সংক্রান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। অন্য একটি আবেদনে এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।৬ অক্টোবরের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের কাছে নোটিশ জারি করেছে। আদালত জানিয়েছে, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি পর্যালোচনা করা হবে এবং আইনসঙ্গত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তা বাতিল করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে।দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিবিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের অভিযোগ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন।তবে নির্বাচন কমিশন এসব নথির অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি। কমিশনের বক্তব্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ভিন্নমত বা পর্যবেক্ষণ থাকা একটি স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং গত এক বছরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত ছিল।এসআইআর নিয়ে মূল বিরোধভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর বর্তমানে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। তবে এসব বাদ পড়া নামের সবগুলো যে স্থায়ীভাবে ভোটাধিকার হারিয়েছে—এমন দাবি করা যায় না; তালিকা সংশোধন ও পুনঃনিবন্ধনের প্রক্রিয়াও রয়েছে।নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি বিরোধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের লক্ষ্য হলো অযোগ্য, মৃত বা একাধিক জায়গায় থাকা ভোটারের তথ্য শনাক্ত করে তালিকা হালনাগাদ করা।কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় দায়িত্ব পালনের সময় নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধরনের দেওয়ানি বা ফৌজদারি কার্যক্রম থেকে সুরক্ষার বিধান রয়েছে। থারুরের নিবন্ধে এই বিধান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।তাঁর মতে, এই ধরনের সুরক্ষা যদি অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়, তাহলে তা নির্বাচন কমিশনারদের জবাবদিহির প্রশ্নকে জটিল করে তুলতে পারে। তবে এই আইনি বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে থারুরের উদ্বেগশশী থারুরের মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর যুক্তি, ভোটার তালিকা সংশোধন, নতুন ভোটার নিবন্ধন, সফটওয়্যার পরিবর্তন এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।তিনি বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আরও স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি প্রকাশ এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও সফটওয়্যার পরিবর্তনের বিষয়ে স্বাধীন নিরীক্ষার পক্ষে মত দিয়েছেন।তবে তাঁর এসব বক্তব্যকে কংগ্রেসের একজন সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক ও মতামতধর্মী অবস্থান হিসেবে দেখা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি তাঁর এবং বিরোধীদের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়।বর্তমানে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কের একটি অংশ রাজনৈতিক আন্দোলনে, আরেকটি অংশ আদালতের বিচারাধীন। ফলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা, এসআইআর প্রক্রিয়া এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে আদালত ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।লেখক পরিচিতি: শশী থারুর ভারতের কেরালা রাজ্যের তিরুঅনন্তপুরম থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসের সংসদ সদস্য এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream