ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
রকারি হাসপাতালের ৭০ অক্সিজেন প্ল্যান্টের ৬১টিই সেবার বাইরে

রকারি হাসপাতালের ৭০ অক্সিজেন প্ল্যান্টের ৬১টিই সেবার বাইরে

সরকারি হাসপাতালের ৭০ অক্সিজেন প্ল্যান্টের ৬১টিই সেবার বাইরেসরকারি হাসপাতালের অক্সিজেন ব্যবস্থায় বড় ঘাটতিদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে ৯৯টি মেডিকেল অক্সিজেন প্ল্যান্ট। তবে এর বড় একটি অংশ বর্তমানে রোগীদের প্রয়োজন মেটাতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্থাপন করা ৭০টি প্ল্যান্টের মধ্যে ৬১টিই বর্তমানে সেবার বাইরে। অর্থাৎ এসব প্ল্যান্টের ৮৭ দশমিক ১৪ শতাংশ হয় কারিগরিভাবে অচল, নয়তো সার্বক্ষণিকভাবে পরিচালনাযোগ্য অবস্থায় নেই।রাজধানীর ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (আইইউবি) শনিবার শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬’-এর প্রথম দিনে উপস্থাপিত এক পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে। সামিটটি ৩ ও ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।৯৯ প্ল্যান্টের মধ্যে ৭০টি সিএমএসডির মাধ্যমেউপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলা হাসপাতাল, ২৮টি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯৯টি পিএসএ (প্রেশার সুইং অ্যাডসর্পশন) ও ভিএসএ (ভ্যাকুয়াম সুইং অ্যাডসর্পশন) অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।এর মধ্যে সরকারের রাজস্ব খাতের অর্থায়নে ৪০টি এবং এডিবির ঋণের অর্থে ৩০টি—মোট ৭০টি প্ল্যান্ট সিএমএসডির মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় স্থাপন করা হয়।পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিএমএসডির অধীনে থাকা ৭০টি প্ল্যান্টের মধ্যে ৩১টি কারিগরিভাবে নষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পুরোপুরি অচল। আরও ৩০টি প্ল্যান্ট কারিগরিভাবে সচল বা ‘ফাংশনাল’ হলেও সেগুলো সার্বক্ষণিকভাবে ‘অপারেশনাল’ নয়।ফলে ৭০টি প্ল্যান্টের মাত্র ৯টি, অর্থাৎ প্রায় ১৩ শতাংশ, কার্যকরভাবে চালু রয়েছে।ইউএনওপিএসের ২৯ প্ল্যান্টের চিত্র ভিন্নঅন্যদিকে, গ্লোবাল ফান্ডের অনুদানে ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেসের (ইউএনওপিএস) মাধ্যমে স্থাপন করা ২৯টি অক্সিজেন প্ল্যান্টের চিত্র ভিন্ন।এসব প্ল্যান্টের নকশা, নির্মাণ ও চালুর দায়িত্ব ইউএনওপিএস সরাসরি বাস্তবায়ন করায় বর্তমানে ২৯টিই ফাংশনাল এবং সার্বক্ষণিকভাবে অপারেশনাল রয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করলেই চিকিৎসাসেবায় এর সুফল নিশ্চিত হয় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ কারিগরি জনবল, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কেন্দ্রীয় পাইপলাইন এবং অক্সিজেনের মান নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হয়। মেডিকেল অক্সিজেন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে।রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবলের সংকটপ্রতিবেদনে বলা হয়, সিএমএসডির আওতায় থাকা সাতটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট এখনো হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত হয়নি।এ ছাড়া অনেক হাসপাতালে স্থায়ী বাজেট ও প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মী না থাকায় সাধারণ কর্মচারীদের দিয়ে প্ল্যান্ট পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে দিনের কয়েক ঘণ্টার বেশি প্ল্যান্ট চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অক্সিজেন উৎপাদন ব্যবস্থার কার্যকারিতাও কমছে। এমনকি উৎপাদিত অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা চিকিৎসায় ব্যবহারের প্রয়োজনীয় মানের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।অনুদান শেষ হওয়ায় নতুন উদ্বেগসামিটে বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেন, একদিকে সিএমএসডির আওতাধীন ৬১টি প্ল্যান্ট দীর্ঘদিন ধরে অচল বা সীমিতভাবে চালু রয়েছে, অন্যদিকে ইউএনওপিএসের মাধ্যমে স্থাপন করা সচল ২৯টি প্ল্যান্টের ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।ইউএনওপিএসের এসব প্ল্যান্টে কর্মরত টেকনিশিয়ানদের বেতন-সংক্রান্ত অনুদান চুক্তি গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ৩১ ডিসেম্বর।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার দ্রুত এসব প্ল্যান্টের কারিগরি জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব না নিলে বর্তমানে সচল প্ল্যান্টগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে নিজস্ব ৬১টি প্ল্যান্ট মেরামত ও পুনরায় চালু করা জরুরি।বছরে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের অক্সিজেন প্রয়োজনসামিটের একটি অধিবেশনে ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটির কো-চেয়ার ও আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বাংলাদেশের অক্সিজেনের চাহিদার একটি চিত্র তুলে ধরেন।গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের (জিবিডি) ২০২৩ সালের তথ্যের ভিত্তিতে করা হিসাবে বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের চিকিৎসায় অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে প্রায় ৫৪ লাখ, তীব্র অসুস্থতায় ১৯ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে প্রায় ২ লাখ মানুষের অক্সিজেন প্রয়োজন হতে পারে।নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ, হৃদ্‌রোগ, আঘাত, সেপসিস, অপরিণত জন্ম, ডায়রিয়া ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের চিকিৎসায় অক্সিজেন গুরুত্বপূর্ণ। হাঁপানি, যক্ষ্মা, এনকেফেলাইটিস, টাইফয়েড, মেনিনজাইটিস ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগেও প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন থেরাপি লাগতে পারে।হাইপোক্সেমিয়ায় বাড়ে মৃত্যুঝুঁকিসামিটে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি নবজাতকের প্রায় ২৪ শতাংশ, শিশুদের ১২ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ১১ শতাংশের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কম বা হাইপোক্সেমিয়া থাকতে পারে। এ অবস্থায় মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।বিশ্বব্যাপীও চিকিৎসায় অক্সিজেনের চাহিদা ব্যাপক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উদ্যোগে দেখা গেছে, অক্সিজেনের ঘাটতি শুধু জরুরি চিকিৎসা নয়, অস্ত্রোপচার, প্রসূতি ও নবজাতক সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনাতেও বড় বাধা তৈরি করতে পারে।জাতীয় ড্যাশবোর্ড তৈরির দাবিসামিটে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ ও অবকাঠামো পরিকল্পনার সময়ই অক্সিজেন প্ল্যান্ট, কেন্দ্রীয় পাইপলাইন, প্রশিক্ষিত অপারেটর এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যাকআপের জন্য পৃথক বাজেট রাখার দাবি জানানো হয়।একই সঙ্গে দেশের সব অক্সিজেন প্ল্যান্টের কার্যকারিতা, উৎপাদন সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ পরিস্থিতি এবং অক্সিজেনের মান পর্যবেক্ষণের জন্য একটি জাতীয় ড্যাশবোর্ড তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।অক্সিজেনের মান নিয়ন্ত্রণে জোরঅধিবেশনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, নিরাপদ মেডিকেল অক্সিজেন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা, কার্যকর অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন।তিনি বলেন, প্রকল্পের শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা দরকার। বায়োমেডিক্যাল, সিভিল ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করে অক্সিজেন প্ল্যান্টের নকশা ও নির্মাণ যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।অক্সিজেনে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন অমিশ্রণ নির্ধারিত মাত্রায় আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।এ ছাড়া হাসপাতালের অক্সিজেন পাইপলাইনকে বিশেষায়িত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে নকশা, নির্মাণ ও তদারকিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।গবেষণার উদ্যোগসামিটে আইইউবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঝিনাইদহের একটি জেলা ও কয়েকটি উপজেলা হাসপাতালে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা এবং সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে গবেষণা করা হবে।গবেষণায় শুধু হাসপাতাল পর্যায়ে অক্সিজেনের ঘাটতি নয়, সংগৃহীত তথ্য কীভাবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে পৌঁছায় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাও পর্যালোচনা করা হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিকেল অক্সিজেনকে শুধু একটি প্রকল্পের অবকাঠামো হিসেবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কেন্দ্রীয় নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream