ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
সৌদি শ্রমবাজারে সংকট: সামনে বিকল্প কী

সৌদি শ্রমবাজারে সংকট: সামনে বিকল্প কী

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাসংকট বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতির গভীর দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। এখন প্রশ্ন শুধু কতজন কর্মী বিদেশে পাঠানো যাবে তা নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁদের জীবন, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলা, ফ্লাইট বাতিল, শ্রমিকদের আটকে পড়া কিংবা ভিসার অনিশ্চয়তা—এসব শুধু সাময়িক ভ্রমণ বিঘ্ন নয়; বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতির জন্য সতর্কসংকেত। সৌদি আরব লাখ লাখ বাংলাদেশির কর্মস্থল, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেখানকার অস্থিরতার অভিঘাত এসে পড়ে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জাতীয় আয়ে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে; সৌদি আরবে কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক যাত্রীর যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। এ সংকটের জন্য সৌদি আরবের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই একমাত্র দায়ী করা যাবে না। বরং এই পরিস্থিতি আমাদের এমন কিছু দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা দেখিয়ে দিচ্ছে, যেগুলো স্বাভাবিক সময়ে সংখ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে। বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু তার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কি একইভাবে পরিপক্ব হয়েছে? বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থানের সাফল্য সাধারণত কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন এবং কত রেমিট্যান্স এল—এই দুই সূচকে বিচার করা হয়। এই হিসাবের আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে, কর্মসংস্থানের এত বড় অংশ যদি শুধু কয়েকটি দেশ ও একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই সাফল্য কতটা টেকসই? প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬২ শতাংশ। এ তালিকায় সৌদি আরবের গুরুত্ব বিশেষ। দেশটির নিরাপত্তা, নিয়োগনীতি বা শ্রমবাজারে পরিবর্তন ঘটলে তার অভিঘাত পড়বে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে। এই নির্ভরতা এক দিনে তৈরি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক পাঠানো সহজতর হয়েছে; অন্যদিকে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সনদের স্বীকৃতি এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে এগিয়েছে। ফলে সৌদি আরবে নিয়োগের সুযোগ বাড়লে আমরা স্বস্তি পেয়েছি আর সেখানে সংকট দেখা দিলে বিকল্প খুঁজতে ব্যস্ত হয়েছি। এটি কেবল বাজারের ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও দুর্বলতা। কোনো দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার কখনো স্থায়ী অধিকার নয়। সৌদি আরবও তার অর্থনৈতিক রূপান্তর, শ্রমনীতি, জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের ধরন বদলাবে। বাংলাদেশের জন্য সেই পরিবর্তন অনুমান করা এবং তার সঙ্গে তাল মেলানো জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার, বর্তমান নিরাপত্তাসংকটের অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি শ্রমের চাহিদা থাকতে পারে। কিন্তু চাহিদা থাকলেই বাংলাদেশের কর্মীরা আগের মতো কাজ পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত সৌদি আরবের বাজারের সুযোগ ধরে রেখে একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো। বাংলাদেশের অভিবাসন সাফল্য মাপা হয় কত শ্রমিক বিদেশে গেলেন, কত রেমিট্যান্স এল, তা দিয়ে। কিন্তু বেতন, চুক্তি, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার হিসাব কোথায়? ফ্লাইট বাতিল হলে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা শ্রমিকের চাকরি ও ভিসা ঝুঁকিতে পড়ে; নতুন কর্মীর যাত্রা আটকে গেলে বাড়ে ঋণের বোঝা। সংঘাতের কারণে কর্মসংস্থান ব্যাহত হলেও ক্ষতির ভার পড়ে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের ওপর। প্রতারণা, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় ও বেতনবঞ্চনার প্রতিকারও জটিল। সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তাই শুধু নিয়োগ বাড়ানো নয়, বকেয়া বেতন আদায়, চুক্তি বাস্তবায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সহায়তা ও সংকটে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শ্রমিক রপ্তানি নয়, তাঁদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা। অভিবাসনের সাফল্য শ্রমিকের সংখ্যায় নয়, তাঁদের সুরক্ষা ও মর্যাদায়। সৌদি আরবের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’ নীতির ফলে অর্থনৈতিক রূপান্তরে সুযোগের ধরন বদলাতে পারে। নির্মাণ, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকসে চাহিদা বাড়লেও নিয়োগে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ভাষাজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত যোগ্যতার গুরুত্ব বাড়বে। একই সঙ্গে সৌদিকরণ নীতি, নিয়োগ ব্যয়, বেতন ও কর্মপরিবেশ বিদেশি শ্রমিকদের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করবে। তাই বিপুলসংখ্যক সাধারণ শ্রমিক পাঠানোর পুরোনো কৌশল যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কোন পেশায় কত কর্মী, কী যোগ্যতায়, কত বেতনে নিয়োগ পাবেন—তা দিয়ে। বাংলাদেশের প্রস্তুতিই হবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মূল শর্ত। বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ। পুরোনো নিয়োগনির্ভরতা ও দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তর। প্রথম পথে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু সংকট ও অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। দ্বিতীয় পথে সৌদি আরবের চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি কাজ, পর্যটন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন মানসম্মত প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা, স্বীকৃত সনদ ও নিয়োগকর্তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপসহ বিকল্প শ্রমবাজারে প্রবেশের বাস্তব বাধা দূর করতে হবে। শ্রমবাজার বৈচিত্র্য ও দক্ষতা উন্নয়নই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন কৌশলের ভিত্তি হওয়া উচিত। সংকট সামলাতে এখনই সরকারের কী করা উচিত? সৌদি আরবের বর্তমান সংকটকে সরকারকে একই সঙ্গে জরুরি মানবিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখতে হবে।  প্রথমত, সৌদি আরবে আটকে পড়া, দেশে ফিরে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা এবং যাত্রার অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের তালিকা করে ভিসা, চাকরি, বকেয়া বেতন ও আর্থিক ক্ষতির সমাধানে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনায় শুধু ফ্লাইট ও নিয়োগ নয়; চাকরির বৈধতা, বেতন, ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিকল্প শ্রমবাজার, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সংকটের পরীক্ষা শুধু শ্রমিক ফিরিয়ে আনা নয়; এমন ব্যবস্থা গড়া, যাতে পরবর্তী সংকটে তাঁদের ভাগ্য অনিশ্চয়তার হাতে ছেড়ে দিতে না হয়। সবশেষে সরকারকে একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতে হবে: বিদেশে কর্মী পাঠানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু বিদেশে পাঠানোর ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থানের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, কারিগরি শিক্ষা শক্তিশালী করা এবং তরুণদের এমন দক্ষতা দেওয়া জরুরি, যা দেশেও কাজে লাগবে, বিদেশেও কাজে লাগবে। সৌদি আরবের বর্তমান সংকট কবে পুরোপুরি কাটবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দেশটির শ্রমবাজার আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে; নতুন খাতেও সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্নটি হলো, আমরা কি সংকট দেখা দিলে সাময়িক ব্যবস্থা নেব, নাকি সংকটের আগেই নিজেদের প্রস্তুত করব? এখন সরকারের সামনে তাই দুটি দায়িত্ব—আজ যাঁরা বিপদে পড়েছেন, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া; আর আগামী দিনের কর্মীরা যেন একই অনিশ্চয়তা ও অসহায়তার মুখে না পড়েন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ● ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। * মতামত লেখকের নিজস্ব

ডিগ্রিধারী তরুণদের কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : শিক্ষামন্ত্রী

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, সরকার উচ্চতর ডিগ্রিধারী তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতেও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম পরিচালনা ও গবেষণার জন্য বাজেট বাড়ানো হয়েছে। রবিবার (১১ অক্টোবর) গাজীপুরের বোর্ডবাজারে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) ৩৮তম সমাবর্তন অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।   সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন বিন ইবনে রিয়াজ। এতে উপ-উপাচার্য ড. হোসেন আরাবি নূরসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট অতিথি, কূটনীতিক, শিক্ষক ও অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ উপস্থিত ছিলেন। তারা গ্র্যাজুয়েটদের সততা বজায় রাখা, আজীবন শেখার মানসিকতা ধারণ করা এবং অর্জিত জ্ঞান সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। বিডি প্রতিদিন/এনআরএইচ

ডিগ্রিধারী তরুণদের কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : শিক্ষামন্ত্রী

ঢাকার রাস্তায় ছুটছে স্কুটার, চালক–যাত্রী দুজনেই নারী, কীভাবে বুকিং দেবেন

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে যানজট। গাড়ির ফাঁক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটি স্কুটার। হেলমেট পরা চালকের চোখ রাস্তায়, পেছনের আসনে নারী যাত্রীও বসে আছেন নিশ্চিন্তে। পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকজনের চোখ আটকে গেল স্কুটারটির দিকে। কারণ, চালক ও যাত্রী—দুজনই নারী। চালকের আসনে ছিলেন সাথী (ছদ্মনাম)। ছয় বছর বয়সী মেয়ের দেখাশোনা ও সংসারের কাজ সেরে সুযোগ পেলেই স্কুটার নিয়ে রাস্তায় বের হন তিনি। পেছনের আসনে বসা অপরিচিত নারীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। অপরিচিত পুরুষের পেছনে বসে যাতায়াতে অস্বস্তি বোধ করেন—এমন নারীদের জন্যই তাঁর এ কাজ। সাথী নারীদের রাইড শেয়ারিং উদ্যোগ ‘মায়া রাইড’-এর একজন চালক। এখানে নারী চালকদের বলা হয় ‘মায়াবী’। গত জুলাই থেকে ৩৮টি রাইড দিয়েছেন তিনি। কোনো দিন তিনটি রাইড দেন, আবার মেয়ের পরীক্ষা বা সংসারের ব্যস্ততায় কয়েক সপ্তাহ মোটরসাইকেল নিয়ে বেরই হতে পারেন না। ফাহাদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস নারীদের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করার লক্ষ্য নিয়ে গত এপ্রিলে ‘মায়া’ উদ্যোগটি শুরু করেছেন। ‘উইমেন–ফার্স্ট রাইড সার্ভিস’ স্লোগানে যাত্রা করা এ উদ্যোগ প্রথমে মোটরসাইকেল দিয়ে শুরু হলেও এখন এতে প্রাইভেট কার ও কার-শেয়ারিং সেবাও আছে। তবে উদ্যোগটির সবচেয়ে বড় সমস্যা, নারী যাত্রীর চাহিদার তুলনায় চালক কম। ঢাকার রাস্তায় চলাচলের সময় ফাহাদ-জান্নাতুল দম্পতি খেয়াল করেন, অনেক নারী রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। কিন্তু অপরিচিত পুরুষ চালকের পেছনে বসে দীর্ঘ পথ যেতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন। তখন তাঁদের মনে প্রশ্ন আসে, চালকও যদি নারী হন? প্রথমে ফেসবুকে পরীক্ষামূলক প্রচারণা চালান ফাহাদ। এতে নারী যাত্রী ও চালক—দুই পক্ষ থেকেই সাড়া আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় ‘মায়া রাইড’। এখন মায়ায় নিয়মিত মোটরসাইকেল সেবা নেন ১০ জনের বেশি নারী। কেউ সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন বুকিং দেন। কেউ অফিসে যাওয়া-আসার জন্য সপ্তাহে ১০টি পর্যন্ত রাইড নেন। সবচেয়ে বেশি চাহিদা গুলশান ও বনানীর অফিস এলাকায়। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও বসুন্ধরা থেকেও বুকিং আসে। সকালে অফিস শুরুর সময় চাপ বেশি থাকে। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে মায়ায় চালক হিসেবে যোগাযোগ করেছিলেন সাথী। সিদ্ধান্ত নিতে প্রায় এক মাস সময় নেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে কথা বলেই শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামেন। বাসে চলাচলের সময় নানা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। আবার প্রাইভেট কার বা অটোরিকশায় উঠলে শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করতেন। নিজের চলাচলের জন্য তাই মোটরসাইকেলই বেছে নেন তিনি। সাথী বলেন, ‘অপরিচিত কোনো পুরুষের সঙ্গে রাইড শেয়ার করতে না চাইলেও অনেক নারীর বিকল্প থাকে না। সেই বিকল্পটা তৈরি করার তাগিদ থেকেই মায়ায় যোগ দিই।’ প্রথম রাইডের দিন ভয়ও ছিল। তবে রাইড শেষে যাত্রী তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপু, অনেকক্ষণ ধরে কোনো রাইডার পাচ্ছিলাম না, আপনি আসায় খুব উপকার হলো।’ এই একটি বাক্যই ভয় দূর করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সাথী। এ কাজে স্বামীর পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন সাথী। তাঁর ভাষ্য, ‘একজন নারীর জন্য পরিবারের এই সমর্থন অনেক বড় শক্তি।’ আনিকা সালসাবিল মায়ার একজন নিয়মিত যাত্রী। দক্ষিণ বনশ্রী থেকে ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে যাতায়াত করেন তিনি। আগে অন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিতেন। ফেসবুকে মায়ার কথা জানার পর এই সেবা নেওয়া শুরু করেছেন। আনিকা বলেন, নারী চালক থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বস্তি। পুরো পথ নিশ্চিন্তে থাকা যায়। অফিসে তাড়া থাকলে মোটরসাইকেলে দ্রুত পৌঁছানোও সম্ভব। তবে চাহিদা অনুযায়ী সব সময় চালক পাওয়া যায় না। বুকিং দেওয়ার পরও কখনো চালক মেলে না। মায়ার নিজস্ব অ্যাপ না থাকায় ফেসবুক বা ফোনে আগে থেকে যোগাযোগ করতে হয় বলে জানিয়েছেন আনিকা। মায়াবী বা নারী চালক হিসেবে রাস্তায় ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় সাথীকে। ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকলে কখনো অটোরিকশাচালকেরা অযাচিত উপদেশ দেন। কোনো কোনো বাস, প্রাইভেট কার বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক খুব ঘেঁষে গাড়ি চালান। কেউ কেউ সাইড দিতেও চান না। সাথী বলেন, ‘একজন পুরুষ রাইডারের সঙ্গে সাধারণত কেউ এমন আচরণ করতে সাহস পায় না।’ তবে সব অভিজ্ঞতা নেতিবাচক নয়। অনেক পথচারী ও চালক হাসিমুখে উৎসাহ দেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে চালু হয় মায়া রাইডের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ। এখনো অ্যাপ চালু হয়নি। যাত্রীরা তাই বর্তমানে ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ফোনকলের মাধ্যমে রাইড বুক করেন। মায়ার হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৬০০টির বেশি রাইডের অনুরোধ এসেছে। সম্পন্ন হয়েছে ৪০০টির বেশি। বর্তমানে দিনে গড়ে সাত থেকে আটটি রাইড হচ্ছে। চালকসংকটের কারণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুরোধ পূরণ করা যায় না। এখনো তাৎক্ষণিকভাবে মায়ার সেবা পাওয়া যায় না। যাত্রীদের এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে বুকিং রিকোয়েস্ট দিতে হয়। এরপর কাছাকাছি থাকা চালকের কাছে রাইডটি দেওয়া হয়। রাইডার নিশ্চিত হলে যাত্রীকে জানিয়ে দেওয়া হয়। দুই পক্ষকেই একে অপরের নম্বর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর যোগাযোগ করে রাইডার নির্ধারিত সময়ে যাত্রীর কাছে পৌঁছে যান। মায়া বলছে, সমস্যা হয় যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর। অনেক চালককে খালি মোটরসাইকেল নিয়ে ফিরতে হয়। এ কারণে তাঁরা দূরের রাইড নিতে চান না। ফলে চাহিদা থাকলেও সব অনুরোধ পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফাহাদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে মায়া রাইড চলছে ওয়েবসাইটনির্ভর ব্যবস্থায়। তবে অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে। অ্যাপ তৈরি হয়ে গেলে সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে। রাইডার ও যাত্রী দুই পক্ষের জন্যই সেবাটা আরও সহজ হবে। মায়ায় চালক বা মায়াবী হওয়ার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ট্যাক্স টোকেনসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র লাগে। উদ্যোগটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, চালক হিসেবে নিবন্ধনে আগ্রহী নারীদের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক বাইক ব্যবহার করেন। তাঁদের অনেকের বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র নেই। এ কারণে ২০ থেকে ৩০ জন আগ্রহী নারীকে এখনো চালক হিসেবে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আবার পারিবারিক কারণেও অনেকে নিয়মিত রাইড দিতে পারেন না। সন্তান বা পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে কেউ কেউ টানা ১০ থেকে ১৫ দিন বিরতিতে থাকেন। মায়া রাইড এখন আর মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও কার-শেয়ারিং সেবাতেই সীমাবদ্ধ নেই; স্কুলগামী শিশুদের জন্যও তারা চালু করেছে ‘মায়া কিডস’ ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম। অনেকের পক্ষে প্রতিদিন সন্তানকে নিজে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া বা ছুটির পর নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। আবার অন্য কারও মাধ্যমে সন্তানকে পাঠাতেও ভরসা পান না অনেকে। এ ভাবনা থেকেই মায়া রাইডের নতুন উদ্যোগ ‘মায়া কিডস’। এ ব্যবস্থাও প্রিবুকিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। মাসিক প্যাকেজের আওতায় এ ব্যবস্থায় বাসা থেকে শিশুকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং স্কুল শেষে নিরাপদে বাসায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে পরিবারের একজন সদস্যও শিশুর সঙ্গে যেতে পারেন। ফলে সন্তান কার সঙ্গে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ও পরিবারের নজরে থাকে। ফাহাদ চৌধুরী বলেন, মায়ার চালক ও যাত্রীদের জন্য এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিমা নেই। যাত্রীদের পরিচয় ফেসবুক প্রোফাইল ও ফোনকলের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। বৃষ্টি বা খারাপ আবহাওয়ায় চালক চাইলে আগাম বুক করা রাইড বাতিল করা যায়। এ ছাড়া কোনো এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও রাইড প্রত্যাখ্যানের সুযোগ আছে বলে জানিয়েছেন ফাহাদ। ফাহাদ বলেন, রাত নয়টা পর্যন্ত মায়ার সেবা দেওয়া হয়। মোটরসাইকেলের প্রতি রাইডে ১০ শতাংশ এবং প্রাইভেট কারে ১৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়। কার-শেয়ারিং সেবায় চারটি গাড়িতে প্রায় ১৫ জন চাকরিজীবী নারী মাসিক চুক্তিতে যাতায়াত করছেন। মায়ার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বসুন্ধরা, বারিধারা ও পুরান ঢাকায় এই সেবা চালু আছে। চালকের সংখ্যা বাড়লে অন্যান্য এলাকায়ও সেবা দেওয়া হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আগামী এক বছরে আরও অনেক দক্ষ, পেশাদার ও ভেরিফায়েড নারী চালককে রাজপথে দেখতে চাই। নারীদের স্বস্তিতে চলাচলের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের আয়ের পথ তৈরি করাই মায়ার লক্ষ্য। ঢাকার রাস্তায় সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছে মায়া।’

ঢাকার রাস্তায় ছুটছে স্কুটার, চালক–যাত্রী দুজনেই নারী, কীভাবে বুকিং দেবেন
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream