ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ বাহন কোনটি

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ বাহন কোনটি

দূরে কোথাও বেড়াতে যাবে। যাওয়ার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ উপায় কী? কোন বাহনে গেলে সবচেয়ে নিরাপদে যাতায়াত করা সম্ভব হবে? উত্তর হলো বিমান। অনেকেরই আকাশে ওড়ার কথা ভেবে বুকটা ধড়ফড় করে! মনে হয়, এত উঁচুতে উড়ব, যদি কিছু হয়ে যায়? অথচ রাস্তায় গাড়িতে চড়তে হয়তো তার অতটা ভয় লাগে না। দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বলছে, সড়কপথে গাড়িতে চলার চেয়ে আকাশপথে বিমানে ভ্রমণ অনেক বেশি নিরাপদ। শুধু তা-ই নয়, যাত্রী পরিবহনের সবচেয়ে নিরাপদ বাহনগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক বিমান সবার ওপরে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিমান এত উঁচুতে ওড়ে, এত দ্রুত চলে, আর যান্ত্রিক কোনো সমস্যা হলে বিপদের আশঙ্কাও তো থাকে। তাহলে বিমানকে সবচেয়ে নিরাপদ বলা হচ্ছে কেন? উত্তর লুকিয়ে আছে পরিসংখ্যানে। দুর্ঘটনা বেশি হলেই কি বাহন বেশি বিপজ্জনক কোন বাহন সবচেয়ে নিরাপদ, তা জানতে শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা গুনলে হবে না। ধরো, একটি বাহনে প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত করে, আর অন্যটিতে চড়ে অল্প কয়েকজন। প্রথম বাহনে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি হলেই যে সেটি দ্বিতীয়টির চেয়ে বেশি বিপজ্জনক, তা বলা যায় না। কারণ, প্রথম বাহনটি অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই গবেষকেরা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা তুলনা করার পাশাপাশি আরও দুটি বিষয় বিবেচনা করেন। এক, যাত্রীরা মোট কত দূরত্ব ভ্রমণ করেছেন। দুই, কত সময় ভ্রমণ করেছেন। মানে, নির্দিষ্ট দূরত্ব বা নির্দিষ্ট সময় ধরে যাতায়াত করলে কোন বাহনে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য ব্যবহার করে ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের একটি গবেষণায় বিভিন্ন বাহনের নিরাপত্তা তুলনা করা হয়েছিল। এতে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলে ভ্রমণ সবচেয়ে বিপজ্জনক। অন্যদিকে বাণিজ্যিক বিমান ভ্রমণ সবচেয়ে নিরাপদ। নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করার ক্ষেত্রে গবেষণাটিতে বাণিজ্যিক বিমানকে গাড়ির তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ গুণ নিরাপদ বলা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এ পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। বাংলাদেশের সব ধরনের বাহনের নিরাপত্তা নিয়ে একই সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদের দেশের তথ্য আলাদা করে বিশ্লেষণ করতে হবে। বিমানে দুর্ঘটনা এত কম কেন বিমান নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পাইলটের। কিন্তু একটি বাণিজ্যিক বিমান নিরাপদে চলার পেছনে শুধু পাইলটের দক্ষতা নয়, আরও অনেক কিছুর ভূমিকা আছে। বিমান পরিচালনা, পাইলটের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিয়মকানুন—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক বিমান চালাতে পাইলটদের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। বিমানের যন্ত্রপাতি নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হয়। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটি বা মানুষের ভুল থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর নানা ব্যবস্থা থাকে। বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে এই ১০ বছরে ১০ কোটির বেশি বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক ফ্লাইটের তুলনায় প্রাণহানির ঘটনা ছিল খুবই কম। গবেষণাটিতে ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে উড়োজাহাজের সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হওয়ার কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। তবে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক ক্র্যাশ বা উড়োজাহাজ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত না হলেও ২০১৮ সালে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১৩৮০-এর ইঞ্জিনের পাখা বিস্ফোরণে এক যাত্রী নিহত হয়েছিলেন। বিমানটির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল। তবে এর মানে এই নয় যে বিমানে কখনো দুর্ঘটনা ঘটে না। দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একটি বড় বিমান দুর্ঘটনায় একসঙ্গে অনেক মানুষের প্রাণহানিও হতে পারে। কিন্তু কোনো বাহন কতটা নিরাপদ, তা বিচার করতে হলে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দুর্ঘটনার বদলে দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান দেখতে হয়। ব্যক্তিগত বিমান আর বাণিজ্যিক বিমান এক নয় এখানে একটি বিষয় জানা জরুরি। সব বিমান কিন্তু সমান নিরাপদ নয়। যাত্রী পরিবহনের জন্য নির্ধারিত বাণিজ্যিক বিমান এবং ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত ছোট বিমান এক ধরনের নয়। ব্যক্তিগত বিমানের ক্ষেত্রে পাইলটের প্রশিক্ষণ, পরিচালনার নিয়ম এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থায় পার্থক্য থাকতে পারে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণের ঝুঁকি বাণিজ্যিক বিমানের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বিমানে মৃত্যুর ঝুঁকি গাড়িতে ভ্রমণের ঝুঁকির প্রায় ১০ গুণ। ছোট বিমানের ক্ষেত্রে যাত্রীসংখ্যা কম হওয়ায় দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। ফলে অল্প কয়েকটি দুর্ঘটনা হিসাবকে অনেকখানি বদলে দিতে পারে। এ কারণে এসব বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিসংখ্যান কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা-ও বিবেচনা করতে হয়। তাই ‘বিমান সবচেয়ে নিরাপদ’ কথাটির অর্থ মূলত নিয়মিত যাত্রী পরিবহনে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক বিমান। ব্যক্তিগত ছোট বিমান বা সব ধরনের আকাশযানের ক্ষেত্রে কথাটি একইভাবে প্রযোজ্য নয়। বাস ও ট্রেনও বেশ নিরাপদ আকাশপথে যেতে ভয় লাগলে বাস বা ট্রেনের কথা ভাবতে পারো। গবেষণায় দেখা গেছে, বাস ও ট্রেনও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বাহন। যাত্রীসংখ্যা বেশি হওয়ায় একটি বাস বা ট্রেন একবারে অনেক মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে একইসংখ্যক মানুষকে আলাদা আলাদা গাড়িতে যাতায়াত করানোর তুলনায় পরিবহনের ধরন অনুযায়ী দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি পরিবহননিরাপত্তা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাস দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা অন্যান্য সড়কযানের তুলনায় অনেক কম। স্কুলবাস, দূরপাল্লার বাস, নগর পরিবহনের বাস, সব মিলিয়ে এই হিসাব করা হয়েছে। ট্রেনের ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ঘটে। তবে রেললাইনের ক্রসিং বা রেলপথ পারাপারের জায়গাগুলোয় ঝুঁকি থাকে। সেখানে অসতর্কভাবে রেললাইন পার হওয়া কিংবা যানবাহন নিয়ে রেলক্রসিংয়ে আটকে পড়া বিপজ্জনক হতে পারে। এর মানে, ট্রেনের ভেতরে যাত্রা নিরাপদ হলেও রেলপথের আশপাশে সতর্ক থাকা জরুরি। নৌযানের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই রকম পার্থক্য দেখা যায়। যাত্রীবাহী ফেরি বা বড় নৌযানে ভ্রমণ আর ব্যক্তিগত বিনোদনের জন্য ছোট নৌকা ব্যবহার এক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নৌযানে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর বড় অংশই ব্যক্তিগত ও বিনোদনমূলক নৌযানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সব নৌযানকে একইভাবে নিরাপদ বা বিপজ্জনক বলা যায় না। সবচেয়ে বিপজ্জনক বাহন কোনটি বিভিন্ন বাহনের তুলনায় মোটরসাইকেলকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর একটি বড় কারণ হলো, মোটরসাইকেলে চালক ও আরোহীর চারপাশে গাড়ির মতো সুরক্ষিত কাঠামো থাকে না। দুর্ঘটনা ঘটলে সরাসরি আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। গবেষণায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট দূরত্ব ভ্রমণের হিসাবে মোটরসাইকেলে মৃত্যুর ঝুঁকি গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি। আরেকটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ মাইল মোটরসাইকেল ভ্রমণে মৃত্যুর হার গাড়ির তুলনায় প্রায় ২৪ গুণ। দ্রুতগতিতে চালানো, মদ্যপ অবস্থায় চালানো এবং অন্য চালকের অসতর্কতাও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান। অবশ্য গাড়িতে ভ্রমণও ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গাড়ির সংখ্যা বেশি এবং সড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের কারণে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে ৫ হাজার ৩৮০ থেকে ৫ হাজার ৪৯০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান (যেমন ২০২৪ সালে মারা যান ৫ হাজার ৩৮০ জন এবং ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৪৯০ জন)। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, যেমন যাত্রী কল্যাণ সমিতি বা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে সংখ্যাটি কিছুটা বেশি। তাহলে কোন বাহনে চড়বে পরিসংখ্যানের হিসাবে বাণিজ্যিক বিমান সবচেয়ে নিরাপদ বাহন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অন্য বাহনে চড়লেই বিপদ হবে। বরং প্রতিটি বাহনের নিরাপত্তা নির্ভর করে কীভাবে সেটি পরিচালিত হচ্ছে, কী ধরনের নিয়ম মানা হচ্ছে এবং যাত্রীরা কতটা সতর্ক থাকছেন, তার ওপরও। বিমানে ভ্রমণের সময় নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলা, বাস বা গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধা, মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা এবং রেলক্রসিংয়ে সতর্ক থাকা—এসব অভ্যাস করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে।

লিওনেল মেসি: লাল কার্ড দিয়ে শুরু, লেজার শোতে শেষ

আকাশি-সাদা জার্সির সঙ্গে লিওনেল মেসির সম্পর্কটা অম্ল-মধুর। আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল ১৩ বছর বয়সেই। এরপর বড় হয়েছেন স্পেনে, বার্সেলোনায়। থাকা-খাওয়া, বেড়ে ওঠা পুরোটাই স্পেনের মাটিতে। স্প্যানিশ বয়সভিত্তিক দলের কোচরাও তাই নজরে নজরে রাখছিলেন তাঁকে। মেসিকে স্পেনের দলে নেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল অনেক, লাভ হয়নি। বাবার প্রচেষ্টাতে যেমন রোজারিও ছেড়ে বার্সেলোনার প্লেনে উঠতে পেরেছিলেন মেসি, তেমনি আর্জেন্টিনা দলের কোচের কাছে মেসির খেলার ভিডিও টেপ পৌঁছে দিয়েছিলেন হোর্হে মেসি। স্প্যানিশদের পাশ কাটিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন লিও। আর সেই ফিরে আসার গল্প শুরু হয়েছিল ৪৭ সেকেন্ডে লাল কার্ড দেখে! হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেকেই লাল কার্ড দেখেছিলেন মেসি। আমরা লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটাকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখতে পারি। প্রথম ভাগে ছিল সম্ভাবনা। দীর্ঘদিন ট্রফি না জেতা আর্জেন্টিনার মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল মেসিকে ঘিরে। দুর্দান্ত প্রতিভাবান মেসি যখন এসেছেন, এবার নিশ্চয়ই কাটবে ট্রফির খরা। কিন্তু ইউরোপিয়ান লিগ সবকিছু জয় করা মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে জিততে পারেননি কোনো ট্রফি। বারবার হতাশ হয়েছেন সমর্থকেরা। হতাশা ঘিরে ধরেছিল মেসিকেও। বারবার তাঁর ওপর ভরসা করে বিশ্বকাপে পা রেখেছে আর্জেন্টিনা। ২০১০ বিশ্বকাপে ছিলেন ম্লান। গোল পাননি। ২০১৪ বিশ্বকাপে একক দক্ষতায় ফাইনালে তুলেছেন আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। মেসিকে বিদ্ধ হতে হয়েছে সমালোচনায়। কটু কথা শোনাতেও পিছপা হননি ডিয়েগো ম্যারাডোনাও। মেসির মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নেই, জাতীয় দলের জার্সিতে এলেই পুরোপুরি ব্যর্থ—এমন অনেক কথা সুচের মতো খুঁচিয়েছে মেসিকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে ১৫ ও ১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল—বারবার মেসি ব্যর্থ মনোরথে শুধু বাড়ির পথ ধরেছেন। ২০১৬ ফাইনালের পর হতাশায় ঘোষণা দিয়ে ফেললেন অবসরের। এ নিয়েও সমালোচনা-ট্রল কম হয়নি। সবকিছুর জবাব দিতেই হয়তো অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে আবার ফিরে আসেন মেসি। সেটাকেই ধরা যায় তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ভাগ। এটাকে মেসির জীবন বদলে দেওয়া সিদ্ধান্ত বললেও বোধ হয় কম বলা হবে। কয়েক মাসের বিরতি নিয়ে ফিরলেন ভিন্ন এক মেসি। ২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সুযোগ পাওয়ারই কথা ছিল না। হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া দলটাকে মেসি তুললেন বিশ্বকাপে। কিন্তু বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে নক আউট পর্বেই হাতছাড়া হয়ে গেল স্বপ্ন। মেসি হাল ছাড়লেন না। এর মধ্যে আশীর্বাদ হয়ে এলেন লিওনেল স্কালোনি। মেসিকে ছাড়া প্রথম কয়েক মাস দলটাকে সাজালেন নিজের মতো। ফলাফল? সাফল্য আছড়ে পড়ল আর্জেন্টিনার কাঁধে। ২০২১ কোপা আমেরিকা দিয়ে শিরোপা খরা ঘোচালেন মেসি। আন্তর্জাতিক শিরোপার যে খোঁটা আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন, সেটাই ঝেড়ে ফেললেন কাঁধ থেকে। বাকি গল্প সিনেমার গল্পের মতো। মেসি পেয়েছেন এমন কিছু খেলোয়াড়, যাঁরা তাঁর জন্য জীবন দিয়ে দিতেও প্রস্তুত। মাঠে তো কোনো কথাই নেই। ২০২২ বিশ্বকাপটা তাই আর্জেন্টাইন ভক্তদের কাছে স্বপ্নের থেকেও বেশি কিছু। কাতারের বিশ্বকাপটা লিওনেল মেসি নিজের করে নিলেন। ৭ ম্যাচে ৭ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট—গোল্ডেন বলের জন্য এর থেকে যোগ্য ছিল না কেউ। ফ্রান্সকে হারিয়ে পেলেন নিজের পরম আরাধ্য, বিশ্বকাপ শিরোপা। মারিও কেম্পেস, ডিয়েগো ম্যারাডোনার পাশে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে নিজের নামটা লিখে রাখলেন আজীবনের মতো। দুই দশকের ক্যারিয়ার পূর্ণতা পেল সেদিন। মেসি চাইলে সেদিনই বুটজোড়া তুলে রাখতে পারতেন। বলেছিলেনও, তাঁর জীবনে পাওয়ার আর কিছু নেই। তবু মেসি খেলেছেন, ২০২২ বিশ্বকাপের পর কোপা আমেরিকা জিতেছেন আরেকবার, জিতেছেন ফিনালেসিমাও। তবু মেসি আরেকবার চেষ্টা করলেন, আমেরিকার মাটিতে আরেকটি বিশ্বকাপ ছিনিয়ে আনার। চেষ্টা করেছিলেন সর্বোচ্চ। ৮ ম্যাচে ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট করে আবারও একক প্রচেষ্টায় দলকে নিয়ে গেলেন ফাইনালে। কিন্তু তিরে এসে এবার আর তরী ভেড়াতে পারলেন না। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে থমকে গেল আর্জেন্টিনা। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা মেসি পেরোতে পারলেন না ফাইনালের বাধা। তাতে অবশ্য মেসির আক্ষেপ থাকার কথা নয়। দুই বিশ্বকাপে রানার্সআপ, এক বিশ্বকাপে শিরোপা। সঙ্গে দুটি কোপা আমেরিকা। ২৮ বছর ধরে বিশ্বকাপের স্বপ্নকে সত্যিতে পরিণত করা। মেসির ক্যারিয়ার রূপকথার মতোই। তাই তো বিশ্বকাপের পর যখন তিন পাতার লেখায় অবসরের ঘোষণা দিলেন, অবাক হননি কেউ। মেসি তো যা জেতার সবকিছু জিতেই ফেলেছেন। শেষ দিনেও যেভাবে বলের পেছনে ছুটেছেন, তিন গোলের তিনটিতেই যেভাবে অবদান রেখেছেন, তাতে তাঁকে শেষ বলা সম্ভব নয় কারও। তবু থামতে তো হয় কখনো না কখনো। মেসিও তাই থামলেন। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটা কোটি আর্জেন্টাইন ভক্তদের চোখে যেমন পানি এনেছে, তেমনি স্বস্তির নিশ্বাসও ফেলেছেন সবাই। কিংবদন্তির বিদায় মনের মতো না হলে অস্বস্তিতে ভোগেন ভক্তরা। মেসির ক্ষেত্রে তা হয়নি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এমন বিদায় পাওয়া প্রত্যেক খেলোয়াড়ের স্বপ্ন। মেসিকে পুরো রোজারিও মিলে উপহার দিয়েছে সেটাই। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শুরু করে পুরো দেশ থেকে বিশ্ব ছিল মেসিময়। এমন বিদায় তো কিংবদন্তিদের জন্যই। মেসি যেন তাদেরও আরেক ধাপ ওপরে।

লিওনেল মেসি: লাল কার্ড দিয়ে শুরু, লেজার শোতে শেষ
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream