ব্রাজিল কেন ঘুরে ঘুরে বিদেশে প্রীতি ম্যাচ খেলে
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে আন্তর্জাতিক বিরতিতে ঘরের মাঠের চেয়ে বিদেশের মাঠেই বেশি দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলা যেন দলটির নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অস্ট্রেলিয়ায় দুটি ম্যাচ খেলার পর কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামে কার্লো আনচেলত্তির দল। এরপর আগামী নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে সিঙ্গাপুরে স্বাগতিক দল ও জাপানের বিপক্ষে আরও দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলার সূচি রয়েছে।
প্রশ্ন হলো—বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় দল হয়েও ব্রাজিল কেন এত বেশি বিদেশে গিয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলে?
সংখ্যাতেই স্পষ্ট বিদেশমুখী প্রবণতা
গত এক দশকের পরিসংখ্যান এ ক্ষেত্রে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বোলাভিআইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচসহ ব্রাজিল মোট ৪৭টি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলেছে।
এর মধ্যে নিজেদের দেশে হয়েছে মাত্র চারটি ম্যাচ। বাকি ৪৩টি ম্যাচই খেলেছে বিদেশের মাটিতে। অর্থাৎ এ সময়ের প্রীতি ম্যাচের প্রায় ৯১ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল দেশের বাইরে।
তুলনায় উরুগুয়ের বিদেশে খেলা প্রীতি ম্যাচের হার ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ, আর্জেন্টিনার ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউরোপের বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে এই হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
মূল কারণ অর্থনীতি
ব্রাজিল ফুটবল দলের বিদেশ সফরের পেছনে সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি হলো অর্থনীতি। ব্রাজিল শুধু একটি জাতীয় দল নয়, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় একটি ফুটবল ব্র্যান্ড।
ব্রাজিলকে নিজেদের দেশে নিয়ে একটি ম্যাচ আয়োজন করতে পারলে আয়োজকদের জন্য সেটি বড় বাণিজ্যিক আয়োজন হয়ে ওঠে। টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, করপোরেট আতিথেয়তা, পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসা—সব মিলিয়ে একটি ম্যাচ ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়।
অন্যদিকে, ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনও এমন ম্যাচ থেকে অ্যাপিয়ারেন্স ফি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পায়।
কলকাতার ম্যাচে বিপুল ব্যয়ের হিসাব
ভারতের কলকাতায় ব্রাজিলের সাম্প্রতিক ম্যাচটি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ‘মিন্ট’-এর প্রতিবেদনের বরাতে প্রথম আলো জানিয়েছে, ম্যাচটি আয়োজনের জন্য প্রায় ৫০ কোটি ভারতীয় রুপির বাজেট ধরা হয়েছিল।
এর মধ্যে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনকে অ্যাপিয়ারেন্স ফি হিসেবে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি রুপি দেওয়ার কথা ছিল। প্রায় ৯০ সদস্যের ব্রাজিল দলের চার্টার্ড ফ্লাইটের পেছনে আরও প্রায় ৬ কোটি রুপি খরচ হতে পারে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন বা ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন নিশ্চিত করেনি। ফলে সংখ্যাগুলোকে প্রকাশিত হিসাব বা অনুমান হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অর্থ ছিল বড় প্রশ্ন
আগস্টের শেষ দিকে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছিল। তারা জাতীয় স্টেডিয়াম পরিদর্শনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওই সময় ৫ বা ৬ অক্টোবর বাংলাদেশে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার প্রস্তাবও দিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু দলটির সফর আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থের সংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
বাংলাদেশ প্রস্তাবে সম্মতি দিলে ভারত সফরের পর ব্রাজিলের ঢাকায় আসার কথা ছিল।
ব্রাজিলকে ঘিরে পর্যটনও বড় বিষয়
বিদেশে ব্রাজিলের ম্যাচ আয়োজন শুধু ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় না। আয়োজক দেশগুলো এটিকে পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও ব্যবহার করে।
সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া সফর তার উদাহরণ। কুইন্সল্যান্ডে ব্রাজিলের দুটি ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরির লক্ষ্যেও।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সিরিজের ৯০ শতাংশের বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছিল এবং টিকিটধারীদের বড় একটি অংশ আয়োজক অঞ্চলের বাইরের দর্শক ছিলেন। ফলে ম্যাচের সঙ্গে হোটেল, যাতায়াত, খাবার ও অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতও লাভবান হওয়ার সুযোগ পায়।
ইউরোপের বড় দলগুলো কেন ভিন্ন
ব্রাজিলের সঙ্গে ইউরোপের বড় দলগুলোর আন্তর্জাতিক সূচিতে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপের দলগুলো ফিফা উইন্ডোর বড় অংশে উয়েফা নেশনস লিগ, ইউরো বা ইউরোর বাছাইপর্বের মতো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলে।
ফলে তাদের জন্য অতিরিক্ত প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
২০১৭ সাল থেকে ইতালি তাদের প্রায় ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ প্রীতি ম্যাচ বিদেশে খেলেছে। স্পেনের ক্ষেত্রে হার ৩৬ শতাংশ, জার্মানির ৩৪ দশমিক ২, ইংল্যান্ডের ২৫ এবং ফ্রান্সের মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ।
দক্ষিণ আমেরিকার বাস্তবতা আলাদা
দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপের মতো নেশনস লিগ নেই। ফলে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর আন্তর্জাতিক সূচিতে প্রীতি ম্যাচের জায়গা তুলনামূলকভাবে বেশি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের বিশাল বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা। ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন আয়োজক ব্রাজিলের মতো দলকে নিজেদের দেশে খেলাতে আগ্রহী। ফলে বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় প্রস্তাব এলে বিদেশ সফরের সুযোগ তৈরি হয়।
মাঠের প্রস্তুতিতেও কাজে লাগে
বিদেশে প্রীতি ম্যাচ খেলার আরেকটি সুবিধা হলো দল গঠনের সুযোগ। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের চাপ ছাড়াই কোচ নতুন খেলোয়াড়কে পরীক্ষা করতে পারেন এবং কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাম্প্রতিক দুটি ম্যাচ এবং ভারতের বিপক্ষে কলকাতার ম্যাচেও ব্রাজিলের একাদশে একাধিক পরিবর্তন দেখা গেছে। এতে দলের বিভিন্ন খেলোয়াড়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরখ করার সুযোগ তৈরি হয়।
ব্রাজিলের নামই বড় বাণিজ্যিক সম্পদ
সবশেষে বিষয়টি দাঁড়ায় ব্রাজিলের বৈশ্বিক ফুটবল ব্র্যান্ডের কাছে। পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী এই দলকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ, তারকা খেলোয়াড়দের জনপ্রিয়তা এবং স্পনসরদের আগ্রহ—সব মিলিয়ে একটি প্রীতি ম্যাচও বড় বাণিজ্যিক ইভেন্টে পরিণত হতে পারে।
তাই ব্রাজিলের প্রীতি ম্যাচের মানচিত্রে এখন শুধু রিও ডি জেনেইরো বা সাও পাওলোর মতো শহর নয়; কলকাতা, টাউনসভিল, ব্রিসবেন ও সিঙ্গাপুরের মতো শহরও জায়গা করে নিচ্ছে।
অর্থাৎ, বিদেশে ব্রাজিলের ঘন ঘন প্রীতি ম্যাচ খেলার পেছনে শুধু ফুটবলীয় কারণ নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বাজার, বাণিজ্যিক আয়, পর্যটন এবং দলের প্রস্তুতির সমন্বিত হিসাব।
মতামত