ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা

‘তাদাব্বুর’: গভীর অভিনিবেশে কোরআন পাঠের শিল্প


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ

‘তাদাব্বুর’: গভীর অভিনিবেশে কোরআন পাঠের শিল্প
ছবি: এএফপি

প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, কত দিনে কোরআন খতম দেওয়া যাবে, প্রতিদিন কত পৃষ্ঠা বা পারা পড়া সম্পন্ন হলো। কিন্তু পৃষ্ঠা উল্টানোর এই সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাবের ভিড়ে প্রায়শই হারিয়ে যায় কোরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য।

কোরআন পাঠকালে মুমিনের আসল উদ্বেগ হওয়া উচিত, কীভাবে এই কিতাব আমাকে হেদায়েত দেবে, কীভাবে আমি আল্লাহর প্রিয় কোরআনের মানুষে পরিণত হব।

কোরআন নিছক কোনো সুর করে মুখস্থ পাঠের গ্রন্থ নয়; বরং এটি মানুষের চিন্তা ও আত্মাকে নাড়া দিয়ে সমাজ ও জীবন বদলে দেওয়ার এক খোদায়ি আহ্বান। 

আর সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো কোরআনে ‘তাদাব্বুর’ বা গভীর অভিনিবেশ ও চিন্তাভাবনা করা।

মহান আল্লাহ কোরআন নাজিলের মূল দর্শন স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন, “এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি—যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা (তাদাব্বুর) করে এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯)

সাধারণ পাঠকের মাঝে একটি বড় বিভ্রান্তি রয়েছে যে ‘তাদাব্বুর’ বুঝি শুধু আলেম বা মুফাসসিরদের কাজ। এটি একটি ভুল ধারণা। ফিকহ ও উলুমুল কোরআনের দৃষ্টিতে ‘তাফসির’ এবং ‘তাদাব্বুর’ দুটি স্বতন্ত্র পরিভাষা:

তাফসির: তাফসির হলো কোরআনের আয়াতের শাব্দিক অর্থ, ব্যাকরণ, শানে নুজুল (নাজিলের প্রেক্ষাপট) ও ইসলামের বিধান উদঘাটন করার একটি শাস্ত্রীয় জ্ঞান। এটি অর্জনের জন্য আরবি ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, উসুলুল ফিকহ ও হাদিসশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য আবশ্যক, যা সুনির্দিষ্টভাবে আলেম ও গবেষকদের দায়িত্ব।

তাদাব্বুর: তাদাব্বুর হলো তাফসিরের মাধ্যমে উন্মোচিত সেই অর্থের আলোকে নিজের জীবন, বিশ্বাস ও কর্ম নিয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা করা।

অর্থাৎ তাফসির যদি হয় আয়াতের অর্থ জানা, তবে তাদাব্বুর হলো সেই অর্থ থেকে হেদায়েতের আলো গ্রহণ করে নিজের জীবনে তার প্রয়োগ খোঁজা। এটি প্রতিটি সাধারণ মুমিনের জন্য উন্মুক্ত ও অবশ্যপালনীয়।

উদাহরণস্বরূপ, সুরা বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের (মুহসিনিন) ভালোবাসেন।”

এই আয়াতের তাদাব্বুর হলো নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা, আমি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে সৎকাজ করি, তবে পরম রবের ভালোবাসা পাব; তাহলে আজ সারাদিনে এমন কী নেক আমল আমি করতে পারি, যার মাধ্যমে আল্লাহর সেই ভালোবাসা অর্জন করা সম্ভব?

বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তাদাব্বুর নিয়ে কিছু অবাস্তব মানসিক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা মানুষকে মূল আমল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়:

১: তাদাব্বুরকে চূড়ান্ত ‘ফলাফল’ মনে করা: অনেকে মনে করেন, আয়াত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে অশ্রুর বন্যা বইয়ে যেতে হবে কিংবা বড় কোনো দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি বের করে ডায়েরিতে নোট লিখতে হবে।

বিষয়টি মোটেও এমন নয়। ‘তাদাব্বুর’ শব্দটি এসেছে ‘দুবুর’ (আয়াতের পরিণতি ও গভীরতা) থেকে, যার অর্থ হলো কোনো আয়াতের শুরু ও শেষ নিয়ে বারবার নিবিড় চিন্তা করা।

তাদাব্বুর কোনো আকস্মিক ফলাফল নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন চিন্তার প্রক্রিয়া। একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগা বা নিজের কোনো ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়াও তাদাব্বুরের জীবন্ত রূপ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রঙিন কলম, আড়ম্বরপূর্ণ নোটবুক কিংবা কফির কাপের মতো কৃত্রিম নান্দনিকতা অনেক সময় আল্লাহর বাণীর চেয়ে বাহ্যিক আয়োজনকেই বড় করে তোলে। অথচ সালাফরা সতর্ক করতেন, বাহ্যিক সাজসজ্জা যেন কোরআনের আসল উপদেশ ও আহকামকে আড়াল না করে ফেলে।

২: শুধু অবসর সময়েই তাদাব্বুর সম্ভব: শয়তানের অন্যতম বড় ধোঁকা হলো মানুষের মনে এই হীনম্মন্যতা তৈরি করা যে আমি তো পাপে নিমজ্জিত, আমি কীভাবে কোরআন বুঝব? কিংবা ‘সংসারের কাজ ও ব্যস্ততা শেষ করে একদম নিরিবিলি অবসর না পেলে কোরআন পড়া যায় না।’

বাস্তবতা হলো, ব্যস্ততা ও দুর্বলতা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; এই সংকটের ভেতরেই কোরআনকে আঁকড়ে ধরা মুমিনের মুক্তির একমাত্র উপায়।

৩: অলৌকিকতা খোঁজার মানসিক চাপ: প্রতিটি আয়াতেই নতুন কোনো অলৌকিক তথ্য আবিষ্কার করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মহানবী (সা.) কখনো কখনো একটিমাত্র সাধারণ আয়াত পাঠ করে সারারাত তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দিতেন। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৫০)

একটি আয়াতেই গভীর মনোযোগ দেওয়া সমগ্র কোরআন অসচেতনভাবে পড়ে ফেলার চেয়ে বহু গুণ শ্রেয়।

৪: পাঠ বনাম তাদাব্বুরের বিভাজন: কেউ কেউ মনে করেন তাদাব্বুর না থাকলে দ্রুত খতম দেওয়া অপরাধ। না, কোরআন পাঠেও সওয়াব আছে। মুসলিম মনীষীদের জীবন ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তাঁরা কখনো শিফার উদ্দেশ্যে, কখনো সওয়াবের উদ্দেশ্যে দ্রুত পাঠ করতেন; আবার কখনো গভীর ভাবাবেগে থেমে থেমে তাদাব্বুর করতেন। এই দুইয়ের মাঝে কোনো বিরোধ নেই।

কোরআনের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিজ্ঞ আলেমদের বাতলে দেওয়া তিনটি পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হতে পারে।

১. মৌলিক তাফসিরের সহায়তা নেওয়া: আয়াত পাঠের পূর্বে অন্তত যেকোনো একটি নির্ভরযোগ্য সহজ তাফসির (যেমন: তাফসিরে সাদি বা তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন) থেকে আয়াতের প্রাথমিক অর্থ ও প্রেক্ষাপট জেনে নেওয়া।

২. আমাকে পাঠানো আল্লাহর বার্তা ভাবা: সাহাবিরা কোরআনকে সাধারণ গ্রন্থ না ভেবে বরং তাঁরা প্রতিটি আয়াতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ব্যক্তিগত বার্তা হিসেবে গ্রহণ করতেন। তাঁরা রাতে সেই বার্তাগুলো নিয়ে একান্তে গভীর চিন্তা করতেন এবং দিনে তা বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করতেন।

৩. অবিরত পাঠ ও অন্তরের উন্মোচন: মুফাসসির আব্দুর রহমান আস-সাদিকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘কীভাবে অন্তরে কোরআনের ভাবাবেগ জাগ্রত করা যায়?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘তুমি পড়তে থাকো, পড়তে থাকো এবং পড়তে থাকো—যতক্ষণ না তোমার রব স্বয়ং তোমার অন্তরের তালা খুলে দেন!’

কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা নিছক পড়া পাতার সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং তা পরিমাপ করা হয় কোরআন পাঠকের চিন্তাভাবনা, চরিত্র ও নৈতিক আচরণে কতটা ইতিবাচক রূপান্তর ঘটাতে পেরেছে তার মাধ্যমে।

বিষয় : ইসলামের কথা কোরআনের কথা কোরআন ইসলামের সৌন্দর্য সিরাত

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

নগদ বার্তা

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


‘তাদাব্বুর’: গভীর অভিনিবেশে কোরআন পাঠের শিল্প

প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, কত দিনে কোরআন খতম দেওয়া যাবে, প্রতিদিন কত পৃষ্ঠা বা পারা পড়া সম্পন্ন হলো। কিন্তু পৃষ্ঠা উল্টানোর এই সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাবের ভিড়ে প্রায়শই হারিয়ে যায় কোরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য।

কোরআন পাঠকালে মুমিনের আসল উদ্বেগ হওয়া উচিত, কীভাবে এই কিতাব আমাকে হেদায়েত দেবে, কীভাবে আমি আল্লাহর প্রিয় কোরআনের মানুষে পরিণত হব।

কোরআন নিছক কোনো সুর করে মুখস্থ পাঠের গ্রন্থ নয়; বরং এটি মানুষের চিন্তা ও আত্মাকে নাড়া দিয়ে সমাজ ও জীবন বদলে দেওয়ার এক খোদায়ি আহ্বান। 

আর সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো কোরআনে ‘তাদাব্বুর’ বা গভীর অভিনিবেশ ও চিন্তাভাবনা করা।

মহান আল্লাহ কোরআন নাজিলের মূল দর্শন স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন, “এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি—যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা (তাদাব্বুর) করে এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯)

সাধারণ পাঠকের মাঝে একটি বড় বিভ্রান্তি রয়েছে যে ‘তাদাব্বুর’ বুঝি শুধু আলেম বা মুফাসসিরদের কাজ। এটি একটি ভুল ধারণা। ফিকহ ও উলুমুল কোরআনের দৃষ্টিতে ‘তাফসির’ এবং ‘তাদাব্বুর’ দুটি স্বতন্ত্র পরিভাষা:

তাফসির: তাফসির হলো কোরআনের আয়াতের শাব্দিক অর্থ, ব্যাকরণ, শানে নুজুল (নাজিলের প্রেক্ষাপট) ও ইসলামের বিধান উদঘাটন করার একটি শাস্ত্রীয় জ্ঞান। এটি অর্জনের জন্য আরবি ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, উসুলুল ফিকহ ও হাদিসশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য আবশ্যক, যা সুনির্দিষ্টভাবে আলেম ও গবেষকদের দায়িত্ব।

তাদাব্বুর: তাদাব্বুর হলো তাফসিরের মাধ্যমে উন্মোচিত সেই অর্থের আলোকে নিজের জীবন, বিশ্বাস ও কর্ম নিয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা করা।

অর্থাৎ তাফসির যদি হয় আয়াতের অর্থ জানা, তবে তাদাব্বুর হলো সেই অর্থ থেকে হেদায়েতের আলো গ্রহণ করে নিজের জীবনে তার প্রয়োগ খোঁজা। এটি প্রতিটি সাধারণ মুমিনের জন্য উন্মুক্ত ও অবশ্যপালনীয়।

উদাহরণস্বরূপ, সুরা বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের (মুহসিনিন) ভালোবাসেন।”

এই আয়াতের তাদাব্বুর হলো নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা, আমি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে সৎকাজ করি, তবে পরম রবের ভালোবাসা পাব; তাহলে আজ সারাদিনে এমন কী নেক আমল আমি করতে পারি, যার মাধ্যমে আল্লাহর সেই ভালোবাসা অর্জন করা সম্ভব?

বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তাদাব্বুর নিয়ে কিছু অবাস্তব মানসিক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা মানুষকে মূল আমল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়:

১: তাদাব্বুরকে চূড়ান্ত ‘ফলাফল’ মনে করা: অনেকে মনে করেন, আয়াত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে অশ্রুর বন্যা বইয়ে যেতে হবে কিংবা বড় কোনো দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি বের করে ডায়েরিতে নোট লিখতে হবে।

বিষয়টি মোটেও এমন নয়। ‘তাদাব্বুর’ শব্দটি এসেছে ‘দুবুর’ (আয়াতের পরিণতি ও গভীরতা) থেকে, যার অর্থ হলো কোনো আয়াতের শুরু ও শেষ নিয়ে বারবার নিবিড় চিন্তা করা।

তাদাব্বুর কোনো আকস্মিক ফলাফল নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন চিন্তার প্রক্রিয়া। একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগা বা নিজের কোনো ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়াও তাদাব্বুরের জীবন্ত রূপ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রঙিন কলম, আড়ম্বরপূর্ণ নোটবুক কিংবা কফির কাপের মতো কৃত্রিম নান্দনিকতা অনেক সময় আল্লাহর বাণীর চেয়ে বাহ্যিক আয়োজনকেই বড় করে তোলে। অথচ সালাফরা সতর্ক করতেন, বাহ্যিক সাজসজ্জা যেন কোরআনের আসল উপদেশ ও আহকামকে আড়াল না করে ফেলে।

২: শুধু অবসর সময়েই তাদাব্বুর সম্ভব: শয়তানের অন্যতম বড় ধোঁকা হলো মানুষের মনে এই হীনম্মন্যতা তৈরি করা যে আমি তো পাপে নিমজ্জিত, আমি কীভাবে কোরআন বুঝব? কিংবা ‘সংসারের কাজ ও ব্যস্ততা শেষ করে একদম নিরিবিলি অবসর না পেলে কোরআন পড়া যায় না।’

বাস্তবতা হলো, ব্যস্ততা ও দুর্বলতা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; এই সংকটের ভেতরেই কোরআনকে আঁকড়ে ধরা মুমিনের মুক্তির একমাত্র উপায়।

৩: অলৌকিকতা খোঁজার মানসিক চাপ: প্রতিটি আয়াতেই নতুন কোনো অলৌকিক তথ্য আবিষ্কার করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মহানবী (সা.) কখনো কখনো একটিমাত্র সাধারণ আয়াত পাঠ করে সারারাত তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দিতেন। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৫০)

একটি আয়াতেই গভীর মনোযোগ দেওয়া সমগ্র কোরআন অসচেতনভাবে পড়ে ফেলার চেয়ে বহু গুণ শ্রেয়।

৪: পাঠ বনাম তাদাব্বুরের বিভাজন: কেউ কেউ মনে করেন তাদাব্বুর না থাকলে দ্রুত খতম দেওয়া অপরাধ। না, কোরআন পাঠেও সওয়াব আছে। মুসলিম মনীষীদের জীবন ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তাঁরা কখনো শিফার উদ্দেশ্যে, কখনো সওয়াবের উদ্দেশ্যে দ্রুত পাঠ করতেন; আবার কখনো গভীর ভাবাবেগে থেমে থেমে তাদাব্বুর করতেন। এই দুইয়ের মাঝে কোনো বিরোধ নেই।

কোরআনের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিজ্ঞ আলেমদের বাতলে দেওয়া তিনটি পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হতে পারে।

১. মৌলিক তাফসিরের সহায়তা নেওয়া: আয়াত পাঠের পূর্বে অন্তত যেকোনো একটি নির্ভরযোগ্য সহজ তাফসির (যেমন: তাফসিরে সাদি বা তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন) থেকে আয়াতের প্রাথমিক অর্থ ও প্রেক্ষাপট জেনে নেওয়া।

২. আমাকে পাঠানো আল্লাহর বার্তা ভাবা: সাহাবিরা কোরআনকে সাধারণ গ্রন্থ না ভেবে বরং তাঁরা প্রতিটি আয়াতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ব্যক্তিগত বার্তা হিসেবে গ্রহণ করতেন। তাঁরা রাতে সেই বার্তাগুলো নিয়ে একান্তে গভীর চিন্তা করতেন এবং দিনে তা বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করতেন।

৩. অবিরত পাঠ ও অন্তরের উন্মোচন: মুফাসসির আব্দুর রহমান আস-সাদিকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘কীভাবে অন্তরে কোরআনের ভাবাবেগ জাগ্রত করা যায়?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘তুমি পড়তে থাকো, পড়তে থাকো এবং পড়তে থাকো—যতক্ষণ না তোমার রব স্বয়ং তোমার অন্তরের তালা খুলে দেন!’

কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা নিছক পড়া পাতার সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং তা পরিমাপ করা হয় কোরআন পাঠকের চিন্তাভাবনা, চরিত্র ও নৈতিক আচরণে কতটা ইতিবাচক রূপান্তর ঘটাতে পেরেছে তার মাধ্যমে।


নগদ বার্তা

সম্পাদক: মোহাম্মদ মঞ্জুরুল কবির (মঞ্জু)
সহ-সম্পাদক: মেহজাবীন মাহবুব পাভেল
প্রকাশক: জাহিন ফয়সাল (শুভ) 

২০২৬ © নগদ বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
‘তাদাব্বুর’: গভীর অভিনিবেশে কোরআন পাঠের শিল্প
0:00 0:00
1.0x
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream