‘হরমুজ কার্ড’ ব্যবহারের সক্ষমতা এখনো ইরানের আছে
হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহন আবারও বাড়তে শুরু করলেও কৌশলগত চাপ তৈরির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে এই জলপথ ব্যবহারের সক্ষমতা ইরান এখনো ধরে রেখেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভি। তাঁর মতে, তেলের প্রবাহ পুনরুদ্ধার হওয়ায় তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ কিছুটা বেড়েছে, তবে এর অর্থ এই নয় যে হরমুজকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
তেল পরিবহন বাড়লেও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বাড়লেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি এখনো জড়িয়ে রয়েছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ পুনরুদ্ধার হলেও ট্যাংকারের বিমা ব্যয় এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশে ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
মোর্তাজাভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামরিক নিরাপত্তা ও নজরদারির মাধ্যমে তেল পরিবহন চালু রাখা সম্ভব হলেও এটিকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচলের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিমা ব্যয় এবং সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার বিষয়গুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
‘হরমুজ কার্ড’ কেন গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এখানে উত্তেজনা বা সাময়িক বিঘ্নও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় হরমুজকে কেন্দ্র করে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মোর্তাজাভির মতে, তেহরান চাইলে এই সক্ষমতাকে সরাসরি বাণিজ্য বন্ধের পরিবর্তে চাপ তৈরির একটি কৌশলগত উপায় হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি
হরমুজে তেল পরিবহন সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটন জলপথটির নিরাপত্তা এবং তেল পরিবহন সচল রাখার বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আগস্টে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি শিপিং করিডোরের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবে এর ফলে ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি বিলীন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও কঠিন। বরং সামরিক নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে বাণিজ্যিক চলাচল সচল রাখার প্রয়োজনীয়তাই দেখিয়ে দেয় যে জলপথটির নিরাপত্তা এখনো বড় কৌশলগত ইস্যু।
ইরানের দরকষাকষির জায়গা
হরমুজকে ঘিরে ইরানের প্রভাবের বিষয়টি শুধু তেল পরিবহনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক অবরোধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনাও।
সেপ্টেম্বরে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত অবসানের বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটির সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয়ে ছাড়ের প্রশ্নও যুক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ফলে হরমুজ এখন শুধু জ্বালানি পরিবহনের একটি জলপথ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
চাপের ধরন বদলেছে
মোর্তাজাভির বিশ্লেষণে ইরানের কৌশলগত সক্ষমতাকে সরাসরি জলপথ বন্ধ করার সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। আল জাজিরার আরেক বিশ্লেষণেও মোর্তাজাভি বলেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরানের প্রতিরোধ কৌশলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা এবং নিজ ভূখণ্ডভিত্তিক প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ, তেল পরিবহনের প্রবাহ বাড়লেও হরমুজকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত গুরুত্ব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বরং নিরাপত্তা ঝুঁকি, সামরিক উপস্থিতি, পরিবহন ব্যয় ও কূটনৈতিক দরকষাকষির সমন্বয়ে এই জলপথ এখনো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি চাপের ক্ষেত্র হয়ে রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে
বর্তমানে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন আগের তুলনায় বাড়লেও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জলপথটির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় কমানোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে নেগার মোর্তাজাভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘হরমুজ কার্ড’ ইরানের হাত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায়নি। তবে তেহরান ভবিষ্যতে এই কৌশলগত সুবিধা কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি, সামরিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।
মতামত