ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ট্রাম্পের মন্তব্য ‘নরকে ব্যয়বহুল অভিযান’
ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) উত্তর ইরাকের ইরবিল বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন বাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশটিতে ইসলামিক স্টেট (আইএস)বিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’-এর ১২ বছরের মিশনের সমাপ্তি ঘটেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক সম্পৃক্ততাকে ‘নরকে খুব ব্যয়বহুল এক অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এই প্রত্যাহারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক—উভয় দেশের জন্য বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরবিল থেকে শেষ মার্কিন সেনাদের বিদায়
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরবিল বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সুশৃঙ্খলভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’-এর সামরিক মিশন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, ইরবিল থেকে জোটের সেনা ও সরঞ্জামের সুশৃঙ্খল প্রত্যাহার ইরাকে আইএসকে সংগঠিত সামরিক হুমকি হিসেবে পরাজিত করার ১২ বছরের অভিযানের সমাপ্তি নির্দেশ করে।
তবে ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার মানেই আইএসবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ টাস্কফোর্সের সদর দপ্তর এখন জর্ডানে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং সিরিয়ায় আইএসবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্পের ‘ব্যয়বহুল অভিযান’ মন্তব্য
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার পেছনে অতীতে ‘খুব খারাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি ইরাকের দীর্ঘ সামরিক সম্পৃক্ততাকে একটি জটিল ও ব্যয়বহুল অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরবিল থেকে মার্কিন বাহিনীর সুশৃঙ্খল প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ওই অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের জন্য বিজয়ের দিন হিসেবেও উল্লেখ করেন। এসব মন্তব্য ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
১২ বছরের আইএসবিরোধী মিশন
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সামরিক মিশন শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, যখন আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। ইরাকি সরকারের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জোট গঠিত হয় এবং আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়।
পরবর্তী কয়েক বছরে আইএস তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অধিকাংশ ভূখণ্ড হারায়। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটি ইরাকে একটি সংগঠিত সামরিক শক্তি হিসেবে পরাজিত হয়েছে। তবে আইএসের অবশিষ্ট সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন হামলা ও সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে আসছে।
ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির দীর্ঘ ইতিহাস
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির বর্তমান অধ্যায়টি ২০০৩ সালের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। সে সময় সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান পরিচালিত হয়।
২০১১ সালে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের পর ইরাকি সরকারের অনুরোধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আবার দেশটিতে সামরিকভাবে ফিরে আসে। ফলে বুধবারের প্রত্যাহারকে ইরাকে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরাকের নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন বাগদাদের
মার্কিন বাহিনী সরে যাওয়ার পর ইরাকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব এখন দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও বাগদাদের সম্পর্ককে যুদ্ধকালীন জোট থেকে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন কাঠামোর দিকে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করলেও প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কিছু কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না; বরং এর ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে।
আইএস ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী নিয়ে উদ্বেগ
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে আইএসের অবশিষ্ট সদস্যদের তৎপরতার আশঙ্কার পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ইরাকির মধ্যে মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ায় সম্ভাব্য নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে কুর্দি অঞ্চলে আইএসের পুনরুত্থান কিংবা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
ইরাকের সামনে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাক তার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি দায়িত্ব নিজ হাতে নেওয়ার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে আইএসের অবশিষ্ট তৎপরতা, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে সামরিক মিশন শেষ করলেও মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় আইএসবিরোধী কার্যক্রম চালু থাকায় ইরাক থেকে প্রত্যাহারকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
মতামত