ইরানের জোড়া চাপে কতটা বিপদে যুক্তরাষ্ট্র
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের মধ্যে কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তেহরানের সাত দিনের একটি প্রস্তাব। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হতে পারে।
তবে ওয়াশিংটন ইরানের প্রস্তাবের শর্তগুলো মেনে নেয়নি। মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরান আলোচনার আগে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ইরানের জব্দ অর্থে প্রবেশাধিকার এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মতো ছাড় চেয়েছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা আগের সমঝোতার কাঠামোর মধ্যেই আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
হরমুজকে ঘিরে ইরানের প্রস্তাব
আব্বাস আরাগচির প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হবে। এর বিনিময়ে ইরান সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করার কথা জানিয়েছে।
তেহরানের প্রস্তাবটি কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছানো হয়। আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবের শর্তগুলো আগের একটি সমঝোতার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং এর প্রভাব জ্বালানি দামের ওপরও পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও হরমুজকে ঘিরে অনিশ্চয়তা জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলেছে। তবে ১ অক্টোবরের বাজার পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি কিছুটা পুনরুদ্ধার হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কেন প্রস্তাবে রাজি হয়নি
যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘবিষয়ক রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, ইরানের প্রস্তাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদে প্রবেশাধিকারের দাবি ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন মনে করেছে তেহরান আলোচনার আগে বড় ধরনের ছাড় চাচ্ছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে আলোচনায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা অর্থ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
ইরানের জন্যও রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ
অন্যদিকে দীর্ঘ সংঘাত ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে। তেল রপ্তানি, বন্দর ও আর্থিক লেনদেনে বাধা দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিকে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা তেহরানের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই ধরনের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করতে পারে। তবে ইরানের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে দেশটির উদ্দেশ্য বা ভবিষ্যৎ কৌশল সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সম্ভব নয়।
ইয়েমেন ও লেবানন প্রসঙ্গ
ইরানের প্রস্তাবে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে যুদ্ধবিরতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে ইয়েমেনের সংঘাতও আলোচনার পরিসরে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ইয়েমেনকে আব্বাস আরাগচির সাত দিনের প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক শর্ত হিসেবে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করার মতো স্পষ্ট তথ্য নেই।
তাই লেবানন ও ইয়েমেনের বিষয়কে একইভাবে দেখা ঠিক হবে না। কোন কোন আঞ্চলিক সংঘাত ভবিষ্যৎ সমঝোতার অংশ হবে, তা আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে।
আলোচনায় নতুন জটিলতা
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলেছে। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার বিষয় হিসেবে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সংঘাতগুলো উঠে এসেছে। তবে আলোচনার এজেন্ডা এবং কোন বিষয়ে কী ধরনের ছাড় দেওয়া হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
১ অক্টোবর ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ জবাব পেয়েছে। তবে সেই জবাবের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। একই সময়ে মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞাও ঘোষণা করেছে। ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও চাপের নীতিও অব্যাহত রয়েছে।
সামনে মূল প্রশ্ন হরমুজ ও নিষেধাজ্ঞা
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলতে হলে কোন শর্তে দুই পক্ষ সম্মত হবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের অর্থনৈতিক বা সামরিক ছাড় দিতে প্রস্তুত হবে।
একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, জব্দ সম্পদ এবং লেবাননসহ আঞ্চলিক সংঘাতগুলো কীভাবে একটি বৃহত্তর সমঝোতার মধ্যে আনা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে তেহরানের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করেছে—এমন বিশ্লেষণ করা হলেও এটিকে একতরফাভাবে কোনো পক্ষের কৌশলগত জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি বাজার ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—সবগুলোই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
মতামত