দুই দশকের বেশি সময় ইরাকে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার পর দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সেনারাও চলে গেছেন। নির্ধারিত সময়সীমার এক দিন আগেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। বাগদাদ এই ঘটনাকে দেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তবে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ প্রত্যাহার
ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবারই দেশটিতে থাকা শেষ মার্কিন সেনারা চলে গেছেন। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক সময়সীমা ছিল বুধবার। ফলে নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই। তাঁর ভাষ্য, বিদেশি সামরিক উপস্থিতি ছাড়াই দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার সক্ষমতা এখন ইরাকি বাহিনীর রয়েছে।
২০২৪ সালে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত
ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে বাগদাদের সমঝোতা হয়। সে সময় ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা ছিল। পরে তাঁদের বেশির ভাগকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কিছু মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। তাঁদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির শুরু ২০০৩ সালের মার্কিন অভিযানের পর। ওই অভিযানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছিল। ২০১১ সালে বড় পরিসরে সেনা প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে আবারও মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়।
ইরাকে আনন্দ ও উদ্বেগ দুটোই
মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ঘটনাকে ইরাকের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি বলেছেন, বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে দেশটি মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পুরো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ইরাকের সব মহলে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ফালুজা অঞ্চলের এক আদিবাসী নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর মনে করেন, নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য ইরাক এখনো প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাঁর মতে, ইরাকের জনগণ সার্বভৌমত্ব চাইলেও মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।
ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
ইরাকে ইরান-সমর্থিত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর এসব গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের চলে যাওয়া কৌশলগতভাবে ইরানের জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এতদিন মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ইরাকের রাজনীতিতে তেহরানের প্রভাবের বিপরীতে একটি ভারসাম্য তৈরি করেছিল। সেই উপস্থিতি না থাকায় আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলাতে পারে।
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর ভূমিকা
ইরাকে সক্রিয় ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সসহ কয়েকটি ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী আঞ্চলিক সংঘাতে সক্রিয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি মাসে ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
এ ছাড়া চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে অবস্থান করছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরাকের সামনে নতুন বাস্তবতা
মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান ইরাকের জন্য দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও এর পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে দেশটির সরকার কতটা কার্যকরভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং আঞ্চলিক সংঘাত ইরাককে কতটা প্রভাবিত করে—এসব বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে ইরাক সরকার বলছে, বিদেশি সেনা ছাড়াই দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় কিছু নেতা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক সম্ভাব্য নিরাপত্তা শূন্যতা নিয়ে সতর্ক করছেন। ফলে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে ইরাকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
মতামত