স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ১১ দলীয় জোটে মতপার্থক্য, সমঝোতার সম্ভাবনাও খোলা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে প্রার্থী দেওয়া ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। আপাতত দলগুলো নিজ নিজ প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি চালানোর অবস্থানে থাকলেও নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সমঝোতার সম্ভাবনা খোলা রাখছেন জোটের নেতারা।
জোটের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হওয়ায় জাতীয় নির্বাচনের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে আসন ভাগ করে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবায়ন করা কঠিন। ফলে শরিক দলগুলো নিজ নিজ সাংগঠনিক অবস্থান ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় প্রার্থী বাছাই করছে।
আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলো আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জোটে আলোচনা হয়েছে। তাঁর মতে, দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রত্যেকে নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।
স্থানীয় সরকারের বিপুলসংখ্যক পদে নির্বাচন হওয়ায় সব এলাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতা করা কঠিন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে তখন বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সিটি করপোরেশন নিয়ে আলাদা হিসাব
জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে। শরিক দলগুলো বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের প্রার্থী ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার জানিয়েছেন, দলটি প্রার্থী বাছাই করে মাঠপর্যায়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে নির্বাচনের পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো কোনো এলাকায় ভবিষ্যতে সমঝোতার সুযোগ থাকতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে কোনো অঞ্চল, জেলা বা উপজেলায় সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোয় সমঝোতা করলে নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে জোটের শরিকদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
মামুনুল হকের বক্তব্য
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে নির্বাচন সামনে এলে বিভিন্ন এলাকায় পারস্পরিক সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের অবস্থান ও স্থানীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বৃহত্তর স্বার্থে কোনো কোনো এলাকায় প্রার্থী প্রত্যাহার বা সমঝোতার বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।
জাতীয় নির্বাচনের সমঝোতার প্রভাব
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বর্তমান ভিন্ন কৌশলের পেছনে জাতীয় নির্বাচনের সময় জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে তৈরি হওয়া অভিজ্ঞতার প্রভাবও আলোচনায় এসেছে।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ২৫৩টি আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল। সে সময় শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে একাধিক দফায় আলোচনা হয়।
পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে শরিকদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা নিয়ে ভিন্ন মত সামনে এসেছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত জোটগত প্রার্থী তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
জোটে ‘অসন্তোষ নেই’—দাবি শরিক নেতার
মতপার্থক্যের আলোচনা থাকলেও জোটের কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে অসন্তোষের কথা স্বীকার করছেন না। বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় শরিকরা আলাদাভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেবে এবং এ নিয়ে জোটে দৃশ্যমান কোনো অসন্তোষ নেই।
একই সঙ্গে জোটের নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিও চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি এবং জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে জোটগত কর্মসূচি—দুই ধরনের কার্যক্রম পাশাপাশি চলছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১ দলীয় জোটের শরিকরা আপাতত নিজস্ব প্রার্থী ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন, জেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী সমীকরণ বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি।
কোথায়, কীভাবে এবং কোন দল কার সঙ্গে সমঝোতা করবে—এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি। নির্বাচনের তফসিল ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার পর জোটের শরিকদের অবস্থান আরও পরিষ্কার হতে পারে।
মতামত