ঢাকা    শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
নগদ বার্তা

মতামত ও বিশ্লেষণ

সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন হুতির ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে?

সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন হুতির ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে?

বহু বছর ধরেই ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়ে আসছে। দেশটির তেল অবকাঠামো থেকে শুরু করে রাজধানী রিয়াদ—কোনো কিছুই তাদের হামলার বাইরে থাকেনি। তবে রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা সৌদি আরবের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ৬ অক্টোবর থেকে চালানো এসব হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ৪০০ জন। সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানায় জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে ইয়েমেনের রাজধানী। প্রশ্ন হচ্ছে, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলাগুলো বারবার কীভাবে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে পারছে? আর দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলো সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সম্পর্কে এসব হামলা কী বার্তা দিচ্ছে? সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। সম্ভাব্য এমন হামলা ঠেকানোর জন্যই এসব ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমআইএম-১০৪ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা। এ ছাড়া সৌদি আরবের কাছে আরও উন্নত টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড ব্যবস্থাও রয়েছে। এই দুই ব্যবস্থাই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রেও এগুলো নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। সৌদি আরবের বিমানবাহিনীতেও রয়েছে উন্নত এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ও ইউরোফাইটার টাইফুন। এগুলো ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে সক্ষম। তারপরও হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বারবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে যাচ্ছে বা তা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। এতে বিশাল ভূখণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখার কঠিন বাস্তবতা সামনে এসেছে। ‘পরিকল্পিতভাবে সংঘাত বাড়ানো’ প্রায় এক দশক ধরে দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে হুতিদের। ২০১৭ সালেও তারা রিয়াদকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। ইউরোপীয় নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্রের (সিইপিএ) প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফেদেরিকো বোরসারি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, এরপর থেকে ইরানের সহায়তায় হুতিদের অস্ত্রভান্ডারে আরও উন্নত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হয়েছে। তবে নতুন কোনো সক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ নেই। তাঁর মতে, আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত লক্ষ্যবস্তুতে বারবার এবং সমন্বিতভাবে হামলা চালানোর সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। বোরসারি আরও বলেন, হামলার সময় দেখে মনে হচ্ছে, ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরুর প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা বাড়ানো হচ্ছে। হুতিরা দেখিয়েছে যে সৌদি রাজধানীর ওপর সরাসরি ক্ষয়ক্ষতি ও চাপ তৈরির সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা—দুটিই তাদের রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা বাড়াতে হুতিরা বহু বছর ধরে কাজ করছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে হুতিরা তাদের দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা আরও উন্নত করেছে। যেসব হামলাকে ব্যর্থ বলে মনে হয়েছে, সেগুলো থেকেও তারা শিখেছে এবং নিজেদের কৌশল বদলেছে। আঞ্চলিক বিভিন্ন স্থানে হামলার অভিজ্ঞতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগিয়ে হুতিরা উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। আল-বাশা বলেন, সৌদি আরব প্যাট্রিয়ট, থাডসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু দেশটির বিশাল ভূখণ্ডের সর্বত্র কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়া হুতিদের জন্য জরুরি নয়। একটি সফল হামলাই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে। বারবার হামলার ঘটনা আরেকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চলতে থাকলে তা মোকাবিলার জন্য সৌদি আরবের হাতে পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে কি না। প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাহী পরিচালক এবং নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিকোলাস হেরাস বলেন, সৌদি আরবের বড় একটি অংশ মরুভূমি। বিশাল দূরত্বের কারণে এই ভূখণ্ডের প্রতিটি জায়গায় কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। এমন এলাকায় আগাম সতর্কতাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য কর্মী নিয়োগ ও তা সচল রাখতেও বেশি খরচ হয়। তবে এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে, ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সময় সৌদি আরবের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে বিপুলসংখ্যক ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। ফলে মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। একই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বোরসারির মতে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে হামলা চালানোর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া। তবে একে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন। তিনি গত মাসের কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন। ওই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমে আসছে। বোরসারি বলেন, এসব খবর সত্য হলে আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন হামলা ঠেকানো হবে, কোন লক্ষ্যবস্তুর জন্য কতটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একসঙ্গে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে হুতিরা। এর মধ্যে রয়েছে একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। অত্যাধুনিক ও বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও দীর্ঘ সময় ধরে চলা ব্যাপক হামলার ক্ষেত্রে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র বা উড়ে আসা অস্ত্র ধ্বংস করতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বোরসারি বলেন, রিয়াদে হামলার ঘটনা সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বারবার হামলার মুখে স্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্ন অস্বীকার করা হবে সরলীকরণ। ব্যয়বহুল পাল্টাপাল্টি কৌশল বোরসারি বলেন, সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী, তা এখনো জানা যায়নি। একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের ওপর। তিনি বলেন, শুধু প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র কতটা উন্নত, তার ওপর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে না। রাডার ও অন্যান্য সেন্সরের আওতা, বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দক্ষতা এবং পর্যাপ্ত গোলাবারুদের মজুতও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসবের যেকোনো একটির দুর্বলতা কিংবা একাধিক সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে হামলা ঠেকানো ব্যর্থ হতে পারে। সৌদি আরবের ভৌগোলিক অবস্থানও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সমুদ্রবন্দর ও সামরিক ঘাঁটি বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এসব স্থাপনায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যয়বহুল এবং কঠিন। বোরসারি বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শত্রুর হামলা শনাক্ত করা। এ জন্য আগাম সতর্কতা নিশ্চিত করতে উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এমন নজরদারি বজায় রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একই সঙ্গে সরঞ্জাম ও জনবলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে ড্রোন মোকাবিলায় তুলনামূলক কম খরচের কিছু বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে আছে স্বয়ংক্রিয় অ্যান্টি-ড্রোন টারেট, যেখানে ভারী মেশিনগান ব্যবহার করা হয়। স্বল্পপাল্লার কম খরচের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। বোরসারি বলেন, আশঙ্কা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতেও সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ড্রোন প্রবেশের ঘটনা চলতে থাকবে। ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান রেনের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের প্রধান এবং প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক ফ্রেডি খুয়েরির মতে, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে শুধু ভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে হামলাকারীরা নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, ইরান ও তাদের সহযোগীরা বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে কীভাবে অভিযান চালাতে হয়, তা শিখছে বলে মনে হচ্ছে। হামলার পথ ও কৌশল পরিবর্তন করে তারা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে হামলা ঠেকাতে প্রতিপক্ষের ব্যয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। খুয়েরির মতে, সৌদি আরবসহ পুরো অঞ্চলের জন্য শিক্ষা হলো—আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিস্তৃত নজরদারি, পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং পরিবর্তনশীল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলানো জরুরি। পল ইডন ইরাকি কুর্দিস্তানের একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, রাজনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালিখি করেন। মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

সৌদি শ্রমবাজারে সংকট: সামনে বিকল্প কী

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাসংকট বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতির গভীর দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। এখন প্রশ্ন শুধু কতজন কর্মী বিদেশে পাঠানো যাবে তা নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁদের জীবন, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলা, ফ্লাইট বাতিল, শ্রমিকদের আটকে পড়া কিংবা ভিসার অনিশ্চয়তা—এসব শুধু সাময়িক ভ্রমণ বিঘ্ন নয়; বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতির জন্য সতর্কসংকেত। সৌদি আরব লাখ লাখ বাংলাদেশির কর্মস্থল, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেখানকার অস্থিরতার অভিঘাত এসে পড়ে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জাতীয় আয়ে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে; সৌদি আরবে কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক যাত্রীর যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। এ সংকটের জন্য সৌদি আরবের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই একমাত্র দায়ী করা যাবে না। বরং এই পরিস্থিতি আমাদের এমন কিছু দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা দেখিয়ে দিচ্ছে, যেগুলো স্বাভাবিক সময়ে সংখ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে। বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু তার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কি একইভাবে পরিপক্ব হয়েছে? বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থানের সাফল্য সাধারণত কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন এবং কত রেমিট্যান্স এল—এই দুই সূচকে বিচার করা হয়। এই হিসাবের আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে, কর্মসংস্থানের এত বড় অংশ যদি শুধু কয়েকটি দেশ ও একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই সাফল্য কতটা টেকসই? প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬২ শতাংশ। এ তালিকায় সৌদি আরবের গুরুত্ব বিশেষ। দেশটির নিরাপত্তা, নিয়োগনীতি বা শ্রমবাজারে পরিবর্তন ঘটলে তার অভিঘাত পড়বে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে। এই নির্ভরতা এক দিনে তৈরি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক পাঠানো সহজতর হয়েছে; অন্যদিকে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সনদের স্বীকৃতি এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে এগিয়েছে। ফলে সৌদি আরবে নিয়োগের সুযোগ বাড়লে আমরা স্বস্তি পেয়েছি আর সেখানে সংকট দেখা দিলে বিকল্প খুঁজতে ব্যস্ত হয়েছি। এটি কেবল বাজারের ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও দুর্বলতা। কোনো দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার কখনো স্থায়ী অধিকার নয়। সৌদি আরবও তার অর্থনৈতিক রূপান্তর, শ্রমনীতি, জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের ধরন বদলাবে। বাংলাদেশের জন্য সেই পরিবর্তন অনুমান করা এবং তার সঙ্গে তাল মেলানো জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার, বর্তমান নিরাপত্তাসংকটের অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি শ্রমের চাহিদা থাকতে পারে। কিন্তু চাহিদা থাকলেই বাংলাদেশের কর্মীরা আগের মতো কাজ পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত সৌদি আরবের বাজারের সুযোগ ধরে রেখে একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো। বাংলাদেশের অভিবাসন সাফল্য মাপা হয় কত শ্রমিক বিদেশে গেলেন, কত রেমিট্যান্স এল, তা দিয়ে। কিন্তু বেতন, চুক্তি, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার হিসাব কোথায়? ফ্লাইট বাতিল হলে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা শ্রমিকের চাকরি ও ভিসা ঝুঁকিতে পড়ে; নতুন কর্মীর যাত্রা আটকে গেলে বাড়ে ঋণের বোঝা। সংঘাতের কারণে কর্মসংস্থান ব্যাহত হলেও ক্ষতির ভার পড়ে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের ওপর। প্রতারণা, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় ও বেতনবঞ্চনার প্রতিকারও জটিল। সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তাই শুধু নিয়োগ বাড়ানো নয়, বকেয়া বেতন আদায়, চুক্তি বাস্তবায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সহায়তা ও সংকটে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শ্রমিক রপ্তানি নয়, তাঁদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা। অভিবাসনের সাফল্য শ্রমিকের সংখ্যায় নয়, তাঁদের সুরক্ষা ও মর্যাদায়। সৌদি আরবের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’ নীতির ফলে অর্থনৈতিক রূপান্তরে সুযোগের ধরন বদলাতে পারে। নির্মাণ, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকসে চাহিদা বাড়লেও নিয়োগে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ভাষাজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত যোগ্যতার গুরুত্ব বাড়বে। একই সঙ্গে সৌদিকরণ নীতি, নিয়োগ ব্যয়, বেতন ও কর্মপরিবেশ বিদেশি শ্রমিকদের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করবে। তাই বিপুলসংখ্যক সাধারণ শ্রমিক পাঠানোর পুরোনো কৌশল যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কোন পেশায় কত কর্মী, কী যোগ্যতায়, কত বেতনে নিয়োগ পাবেন—তা দিয়ে। বাংলাদেশের প্রস্তুতিই হবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মূল শর্ত। বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ। পুরোনো নিয়োগনির্ভরতা ও দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তর। প্রথম পথে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু সংকট ও অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। দ্বিতীয় পথে সৌদি আরবের চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি কাজ, পর্যটন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন মানসম্মত প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা, স্বীকৃত সনদ ও নিয়োগকর্তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপসহ বিকল্প শ্রমবাজারে প্রবেশের বাস্তব বাধা দূর করতে হবে। শ্রমবাজার বৈচিত্র্য ও দক্ষতা উন্নয়নই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন কৌশলের ভিত্তি হওয়া উচিত। সংকট সামলাতে এখনই সরকারের কী করা উচিত? সৌদি আরবের বর্তমান সংকটকে সরকারকে একই সঙ্গে জরুরি মানবিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখতে হবে।  প্রথমত, সৌদি আরবে আটকে পড়া, দেশে ফিরে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা এবং যাত্রার অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের তালিকা করে ভিসা, চাকরি, বকেয়া বেতন ও আর্থিক ক্ষতির সমাধানে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনায় শুধু ফ্লাইট ও নিয়োগ নয়; চাকরির বৈধতা, বেতন, ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিকল্প শ্রমবাজার, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সংকটের পরীক্ষা শুধু শ্রমিক ফিরিয়ে আনা নয়; এমন ব্যবস্থা গড়া, যাতে পরবর্তী সংকটে তাঁদের ভাগ্য অনিশ্চয়তার হাতে ছেড়ে দিতে না হয়। সবশেষে সরকারকে একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতে হবে: বিদেশে কর্মী পাঠানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু বিদেশে পাঠানোর ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থানের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, কারিগরি শিক্ষা শক্তিশালী করা এবং তরুণদের এমন দক্ষতা দেওয়া জরুরি, যা দেশেও কাজে লাগবে, বিদেশেও কাজে লাগবে। সৌদি আরবের বর্তমান সংকট কবে পুরোপুরি কাটবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দেশটির শ্রমবাজার আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে; নতুন খাতেও সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্নটি হলো, আমরা কি সংকট দেখা দিলে সাময়িক ব্যবস্থা নেব, নাকি সংকটের আগেই নিজেদের প্রস্তুত করব? এখন সরকারের সামনে তাই দুটি দায়িত্ব—আজ যাঁরা বিপদে পড়েছেন, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া; আর আগামী দিনের কর্মীরা যেন একই অনিশ্চয়তা ও অসহায়তার মুখে না পড়েন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ● ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। * মতামত লেখকের নিজস্ব

সৌদি শ্রমবাজারে সংকট: সামনে বিকল্প কী

চুয়েট উপাচার্যের চেয়ারে কেন সরকারের ছায়া!

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত সহ–উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে শপথ পাঠ করিয়েছিলেন তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও শিক্ষার্থীরা (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, প্রথম আলো)। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আসেন অধ্যাপক ইয়াহ্‌ইয়া আখতার। গত বছরের জুলাইয়ে এই উপাচার্যের কার্যালয়ে এক শিক্ষকের পদোন্নতি আটকাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতা গিয়ে হট্টগোল করেন। সে সময় তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘আপনি নিজ যোগ্যতায় (উপাচার্য পদে) বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’ (৫ জুলাই ২০২৫, প্রথম আলো)। প্রায় এক বছর পর চট্টগ্রামেরই আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে বাতিল করে আগের উপাচার্যকে বহাল রাখার দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যেই ১২ অক্টোবর ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেছেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম (১২ অক্টোবর ২০২৬, প্রথম আলো)। পরপর এ তিনটি উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়। তিনটি ঘটনায় তিনটি ভিন্ন সংগঠন, তিনটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি দুটি ভিন্ন সরকারের সময়। কিন্তু চিত্রের কোনো হেরফের হয়নি। ঠিক পুরোনো কাঠামোর মতোই উপাচার্যের চেয়ারে কে বসবেন, কীভাবে বসবেন, বসে কী করবেন, তা ঠিক করে দিচ্ছেন ছাত্রনেতারা। সরকার বদলায়, সংগঠনের নাম বদলায়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ছাত্ররাজনীতির এই খবরদারির কোনো পরিবর্তন হয় না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইন অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে এর কার্যনির্বাহী প্রধান হলেন উপাচার্য। কিন্তু আমরা কী দেখছি? এক দল এসে উপাচার্যকে বলছে, আমরাই আপনাকে বসিয়েছি। আরেক দল শিক্ষার্থীদের চাওয়া–পাওয়ার বাইরে গিয়ে উপাচার্যকে চেয়ারে বসিয়ে দিচ্ছে। উপাচার্য কী করবেন আর কী করবেন না, তা ঠিক করার দায়িত্বও তারাই নিয়ে নিচ্ছে। কী অদ্ভুত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কী অদ্ভুত আমাদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো! একজন উপাচার্য যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রধান হন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ভেতর থেকে তাঁর নির্দেশনায় সবকিছু হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের উপাচার্যদের চেয়ার এতটাই কাদামাটির ওপর বসানো থাকে যে কখন সেটি দেবে যায়, আবার কখন সেই চেয়ারের পায়া ভেঙে তিনি নিজেই পড়ে যান, তা কেউ জানে না। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতি উপাচার্যদের নরম অবস্থান আজকের নয়। কয়েক দশক ধরে উপাচার্যেরা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। যখনই উপাচার্য বিপদে পড়েন, সেটা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন ঠেকানো হোক কিংবা কর্মকর্তা–কর্মচারীদের আন্দোলন সামলানো, সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোকেই। অন্যদিকে এসব সংগঠনের নেতাদের খুশি রাখতে উপাচার্যেরা কখনো পছন্দের ব্যক্তিদের টেন্ডার পাইয়ে দেন, শিক্ষক–কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়োগ দেন, আবাসিক হলে তাঁদের আধিপত্যের সুযোগ করে দেন। আবার আধিপত্য বিস্তারে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোকে দমন করতে তাঁদের প্রশাসনিক সহায়তাও দেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতা–চর্চার এই ভয়াবহ রূপ আমরা দেখেছি। তবে এই দেনা–পাওনার চিত্র কখনোই বদলায় না। ফলে দলীয় শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় আনা হয়, আর তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব নেয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলো। এর মাশুল গুনতে হয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে। যে উপাচার্য নিজের চেয়ারের জন্য কোনো ছাত্রসংগঠনগুলোর কাছে ঋণী হচ্ছেন, তিনি পরবর্তী সময় তাদের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নৈতিক শক্তি রাখেন না। এই যে চুয়েটের কথাই ধরেন না। এখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা এক উপাচার্যের নিয়োগ বাতিলের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন পত্রিকাগুলোয় ফলাও করে নিউজ আসছে। কিন্তু দেখেন, আমাদের সরকার সেই খবরগুলো দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। গণমাধ্যমের খবরগুলো আমলেই নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ব্যাপারটি এমন হয়ে গিয়েছে, ওই উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম করতে না পারলে চুয়েটের শিক্ষার বারোটা বেজে যাবে। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে পেয়ে ধন্য ধন্য মনে করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকার এখানে নিজেকে গুটিয়ে রেখে প্রমাণ করতে চেয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো ‘সরকার’, এখানে শিক্ষার্থীরা ভেসে আসা কোনো উপাখ্যান। অন্যদিকে যে ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের নৈতিক আন্দোলনে শরিক হওয়ার কথা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে ঐক্য দেখানো, সেখানে ছাত্রসংগঠনটি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। ফলে সরকারের পরামর্শে চুয়েটের নিয়ম ভেঙে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমকে অনলাইনে যোগদান করিয়েছে, শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করিয়েছে, এবার তাঁকে চেয়ারে বসানোর দায়িত্ব দিয়েছে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের কাঁধে। ফলে এই পুরো বিষয়টি সরকারের দৃষ্টির বাইরে ঘটেনি; বরং সরকারের প্রত্যক্ষ অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বন্ধ থাকলেও সরকারের দৃষ্টি সেই পর্যন্ত পড়েনি। আমরা উপাচার্যের চেয়ারে বসানোর নোংরা চেহারা দেখলাম। এখন প্রশ্ন হলো, আন্দোলনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কী হবে? ক্ষমতার দাপটে উপাচার্য এগিয়ে গেলেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক অধিকার ও ক্ষমতা চর্চায় যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রাধান্য পাওয়ার কথা, সেখানে তাঁরা আজ এই উপাচার্যের আক্রোশের শিকার যে হবেন না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? যে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের চেয়ে ছাত্রনেতারা বড়, সেখানে জ্ঞানচর্চা ছোট হতে বাধ্য। চব্বিশে শিক্ষার্থীরা বৈষম্য আর দখলদারির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে এমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়া, যেখানে উপাচার্যের চেয়ার কারও দয়ায় নয়, যোগ্যতায় পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা আমরা দেখতে পাইনি; বরং অতীতের সব ধরনের রেকর্ড ভেঙে এবারের উপাচার্য নিয়োগে খেয়ালখুশিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কোন মানদণ্ডে, কাদের মধ্য থেকে, কার সুপারিশে একজন অধ্যাপক উপাচার্য হন, তা কখনো প্রকাশ্যে আসে না। প্রক্রিয়া যেখানে অস্বচ্ছ, সেখানে যোগ্যতার বদলে দলীয় আনুগত্য আর রাজপথের শক্তিই হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তের মাপকাঠি। শিক্ষকরাজনীতিও এর বাইরে নয়। শিক্ষকদের একাংশ দলীয় পরিচয়কে পদ–পদবির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন, আর সেই সিঁড়িতে ওঠার জন্য তাঁদের প্রয়োজন হয় ছাত্রসংগঠনের সমর্থন। প্রশ্ন হলো, সরকার কি সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কথা শুনতে পায়? ক্ষমতায় গেলে কেন তারা বুঝতে পারে না, ছাত্রসংগঠন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ক্ষমতার মালিক সাধারণ শিক্ষার্থীরা? সাধারণ শিক্ষার্থীরা কী করতে পারে, তা তো অতীতে এই দেশ দেখেছে। এভাবে উচ্চশিক্ষার কাঠামো টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যেখানে উপাচার্যেরা চেয়ারের লোভে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, ছাত্রসংগঠনগুলোর কথায় ওঠবস করার মানসিকতা তৈরি করে ফেলেন, সেখানে উচ্চশিক্ষার ম্যাজিক লণ্ঠন আলোহীন হয়ে পড়বে। ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]

চুয়েট উপাচার্যের চেয়ারে কেন সরকারের ছায়া!

যে কারণে এআইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নিষেধ করলেন মাক্রোসফটের সিইও

মাক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বা এআই অন্ধভাবে বিশ্বাস না করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি। তিনি সতর্ক করেছেন, সংবেদনশীল ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পেলে উন্নত এআই মডেল গুরুতর ভুল করতে পারে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শনিবার এক্সে দীর্ঘ এক পোস্টে নাদেলা যুক্তি দেন, মডেলগুলো কেন একটি নির্দিষ্টভাবে আচরণ করে, তা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় ব্যাখ্যা করতে পারে না। তাই স্বাধীন সুরক্ষাব্যবস্থা অপরিহার্য। নাদেলা লেখেন, অনির্ধারিত মডেলগুলোকে ঘিরে শক্তিশালী ও নির্ধারিত সিস্টেম ডিজাইন, মানুষের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভরযোগ্য কার্যপ্রণালি রাখতে হবে। যেখানে বিদ্যমান মান অপর্যাপ্ত, সেখানে শিল্পখাতের মান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি আরও লেখেন, অত্যাধুনিক ক্লোজড ও ওপেন-ওয়েট মডেলকে ভেতরের ঝুঁকির মতো গণ্য করা এমন ব্যবস্থা গড়ার একটি উপায়। নাদেলা জোর দিয়ে বলেন, এআই ব্যবস্থা যে ক্ষতিকর, তা নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দিলে এদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, এর অর্থ হলো মডেলকে আলাদা রাখা, যে কাঠামো এর কাজ সমন্বয় করে তার থেকে এবং যে কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ করে এটি কী করতে পারবে, তা থেকেও। এর অর্থ নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থাকে বাইরে রাখাও। নিরাপদ এআই প্রয়োগের জন্য সাতটি নীতির প্রস্তাব দিয়েছেন নাদেলা। এর মধ্যে রয়েছে মডেলের আচরণ পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন নিরীক্ষা, নিরন্তর পরীক্ষা এবং মানুষের হস্তক্ষেপ। তিনি লেখেন, একে ইমার্জেন্সি ব্রেকের মতো ভাবুন। কোনও অনুমোদিত ব্যক্তি যেন কাজ চলাকালেই মডেল থামাতে বা বন্ধ করে দিতে পারেন। নাদেলা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এআই-সংক্রান্ত ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের কথা ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত জানানোর আহ্বানও জানান। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বুঝতে পারবে কী ভুল হয়েছিল এবং একই ধরনের ঘটনা কীভাবে ঠেকানো যায়।  বক্সের প্রধান নির্বাহী অ্যারন লেভি নাদেলার অবস্থানকে সমর্থন করে বলেন, এআইয়ের জন্য জিরো ট্রাস্টের যুগ দরকার হবে। লেভি বলেন, এ সবকিছুর পরিণতিতে বিভিন্ন স্তরের সুরক্ষা এবং এজেন্টরা কী করছে, কোন তথ্য নিয়ে কাজ করতে পারবে এবং কিছু ভুল হলে কী নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তার নিরীক্ষাযোগ্যতা প্রয়োজন। এখন পুরো এন্টারপ্রাইজজুড়ে এমন ব্যবস্থা যারা গড়ছেন, তাদের জন্য বিশাল সুযোগ রয়েছে। এআই নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠা এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নাদেলার এ মন্তব্য এলো। বিজনেস ইনসাইডারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের তৈরি এআই মডেলকে ঘিরে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো এদের আচরণ যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কিনা। এর মধ্যে মার্কিন সিনেটর জশ হলি ও ক্রিস মার্ফি ১ অক্টোবর দ্বিদলীয় একটি আইনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর লক্ষ্য হ্যাকিংয়ের ঘটনায় এআই ডেভেলপার ও পরিচালনাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস  

যে কারণে এআইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নিষেধ করলেন মাক্রোসফটের সিইও

বিএনপির কর্মীরা বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন কি 

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী কর্মী-সংগঠক বন্ধুদের অভিনন্দন। সরকারের সাংগঠনিক ভিত্তি হিসেবে আপনারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। আগেও আপনাদের দল অন্তত চারবার নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৫০ ভাগ এবং দুই শতাধিক সংসদীয় আসন পেয়েছে। দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এখন আপনাদের সঠিক ভাবনা ও পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। নাগরিক হিসেবে স্বস্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আপনাদের মুখাপেক্ষী হওয়ার বিকল্প নেই। এই চিঠি তার বিনীত ব্যক্তিগত প্রকাশ। নির্বাচনে যাঁদের ভোট পেয়েছেন এবং যাঁদের পাননি—সবার অভিভাবক আপনারা। দল যার যার হলেও—সরকার সবার। অন্তত হওয়ার কথা। হওয়া প্রয়োজন। পণ্ডিতেরা না চাইলেও এ দেশে সরকার ও দল একাকার হয়ে যায়—সুতরাং আপনারাই নাগরিকদের একমাত্র পোস্ট অফিস। উপরন্তু এ দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা ও তার অনুশীলন এমন, কোনো দলের ১৫০-এর বেশি আসন পাওয়া মানে বিরোধী দল কাগুজে বাঘে পরিণত হওয়া। তখন সরকার যা চায়, যেভাবে চায় সংসদে সেভাবে ‘হ্যাঁ’-‘না’ জয়যুক্ত হয়। ইতিহাস বলছে, এর পরিণতি সুখকর নয়। অতীতে যখন এ দেশ বিরোধী দলশূন্য ছিল বা তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি—তখন সরকার বিপদে পড়েছে, দেশবাসীও মুশকিলে পড়েছে। পুরোনো শাসক দলের কর্মী-সংগঠক হিসেবে আপনাদের জানা, বাংলাদেশে প্রশাসনতন্ত্রের যা চরিত্র, তাতে এটা সত্যি যে তাঁরা মাঠের প্রকৃত বাস্তবতা জানানোর সাহস রাখেন না—হয়তোও চানও না। এ রকম অবস্থায় প্রান্ত থেকে হরেক বিষয়ে বিরোধী দলের চিৎকার-চেঁচামেচি সরকারের মেঠো বাস্তবতা জানা-বোঝার কাজ এগিয়ে দেয়। এভাবে গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের সুরক্ষার কাজ করে। আমাদের ‘ঐতিহ্য’ সে রকম নয়। বারবার যে এ দেশে সরকার অমর্যাদাকর ও সহিংস পথে বিদায় নেয়, তার কারণ সবল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের অভাব বা সেভাবে বিরোধীদের কাজ করতে না দেওয়া। আবার আমরা সেই ধরনের শঙ্কার মুখে পড়ছি কি না—আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখছি। এটা সত্য, ভোটে এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার রায় পেয়েছে বিএনপি। কিন্তু দলের নীতিনির্ধারকেরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে নিচ্ছেন কি না, সেটা মূল্যায়ন ও পুনর্ভাবনার দায়িত্ব আপনাদের। দলহীন নাগরিক সমাজের সেসব মূল্যায়ন শেষে সচিবালয় বা জাতীয় সংসদে পৌঁছানোর কার্যকর কোনো রাস্তা নেই। এ ক্ষেত্রে আপনাদেরই গঠনমূলক বিরোধী দলের হিম্মত দেখাতে হবে। এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত, পছন্দ, অপছন্দ—সবই ওপর থেকে আসে। ছোট একই গ্রুপ বা গোষ্ঠীই অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতীয় সিদ্ধান্ত নেয়। এ রকমভাবে নেওয়া সিদ্ধান্তে কোনো খারাপ ফল এলে অন্য সবার সঙ্গে বিপদে পড়েন শাসক দলের কর্মীরাও। ২০২৪-এ ক্ষমতাচ্যুত শাসকদের সব সিদ্ধান্তে নিশ্চয়ই তাদের মেঠো কর্মীদের মতামত রাখার সুযোগ ছিল না। কিন্তু নিদারুণভাবে সেই শাসন-সংস্কৃতির ভুক্তভোগী এখন তাঁরা। কবে তাঁদের এই ভোগান্তি কাটবে, কেউ জানে না। অথচ তাঁদের ‘নেতা’রা ইউরোপ-আমেরিকায় খারাপ নেই। এ থেকে পরবর্তীকালের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। আবার একই অবস্থা তৈরি হতে না দেওয়ার উপায় হলো শাসক দলের কর্মীদের প্রতিনিয়ত স্বাধীন মতামত তুলে ধরা। সরকারি কাজে ভুল হলে আগেভাগে নীতিকর্তাদের থামতে প্ররোচিত করা এবং পারলে থামানো। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে এমন এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গেছে—শাসক দলের সিদ্ধান্তের জন্য কর্মীদের ভয়ংকরভাবে দায় মেটাতে হয়। সুতরাং দলের সবকিছুকে প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন করে গেলে তা হবে আত্মঘাতী। নিশ্চয়ই আজ ও আগামী দিনের কোনো শাসক দলের কর্মীরা বিগত ক্ষমতাচ্যুত দলটির কর্মীদের মতো পালিয়ে বাঁচতে চাইবেন না। সে জন্য প্রয়োজন দলীয় নেতৃত্বকে জবাবদিহির চাপে রাখা। এটা নিজস্ব রাজনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থেও কর্তব্য হয়ে উঠেছে। ইতিহাস আমাদের সে রকম নতুন এক অধ্যায়ে নিয়ে এসেছে। কথাটা রূঢ় শোনাবে হয়তো, রাজনীতিবিদেরা রাজনীতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে ফেলেছেন। ফলে রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এখন দলীয় ঊর্ধ্বতনদের কাজকর্ম নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন থাকা ও প্রকাশ করা দরকার। আওয়ামী লীগ-উত্তর সময়ের বড় শিক্ষা হলো অন্ধ ‘সহমতে’র চেয়ে সৎ ভিন্নমত বেশি নিরাপত্তাদায়ী। বিএনপি সরাসরি ভোটে দুই শর বেশি আসন পেয়েছে। সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে বিপুল এমপি আপনাদের। কিন্তু সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্বে অনির্বাচিতরাও আছেন। বিদেশফেরত অনেকেও আছেন। এটা এ দেশে নতুন ঐতিহ্য নয়। যদি নীতিনির্ধারক কারও সমাজের সঙ্গে দীর্ঘকালের নিবিড় সম্পৃক্ততা না-ও থাকে, সেটা পুষিয়ে দিতে পারেন মাঠপর্যায়ের কর্মী-সংগঠক-সহযোগী আপনারা। তৃণমূলে সক্রিয় থাকার কারণে আপনারা জানেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য কোন পদক্ষেপ আগে নেওয়া দরকার। বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে ডজন ডজন এয়ারবাস ও বোয়িং বিমান দরকার নাকি কৃষি, পোলট্রি, মৎস্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার—সেটা আপনাদেরই সবচেয়ে ভালো বোঝার কথা। এমপি-মন্ত্রীদের সেসব জানাতে পারেন আপনারা। এসব বিষয়ে নিজেদের কথা এখনই জেলা, উপজেলা কমিটির বৈঠকে জানান। নিশ্চয়ই আপনারা দেখেছেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সম্প্রতি বেশ নিম্নমুখী। খবরগুলো ছোট হলেও বৃহৎ বার্তা থাকে তাতে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে এ বছর বাংলাদেশ এক ধাক্কায় ৫৫ ধাপ পড়ে গেছে। নারীরা আমাদের জনসংখ্যার ৯-১০ কোটি। তাদের দুরবস্থা বাড়া মানে পুরো দেশের সমৃদ্ধি কমা। আপনাদের বহুল আলোচিত ‘৩১ দফা’র ২৩তম দফার সঙ্গে এই সংবাদ একদম মিলছে না। গেল সপ্তাহেই বিশ্বব্যাংক জানাল, দারিদ্র্যসীমার কাছে কোনোভাবে টিকে আছে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ—যারা যেকোনো অর্থনৈতিক সমস্যায় নিচে পড়ে যেতে পারে। বাড়তি বিপদের কথা—চার বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক সঙ্গে এ-ও বলছে, ২০২৬ সালে ২১ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়ে গেছেন। বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব প্রতিবেদন দেশের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই দেখছেন। বিরোধী দলের নেতারাও হয়তো দেখছেন। সংসদের আলাপ-আলোচনা-সিদ্ধান্তে তার ছাপ আছে কি? বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমান দারিদ্র্য হার ও ভবিষ্যতের উদ্বেগজনক দারিদ্র্য-শঙ্কা কমাতে বাংলাদেশের দরকার বিপুল কর্মসংস্থান। কিন্তু সরকার গত আট মাসে খরচপাতির বড় খাতা খুলল মেট্রোরেল, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন ও উড়োজাহাজ কেনায়। মাঠের চাহিদার সঙ্গে এসব বাস্তব অগ্রাধিকারের ঠিকঠাক মিলছে কি? শাসক দলের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের কর্মী হিসেবে আপনাদের কাছেই আমরা এসব জানতে চাইব! ৩ কোটি ৭৬ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন আপনাদের। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কর্মচারী কত, আর বেকার তরুণ-তরুণী, শ্রমিক-কৃষক কত—সেসব বিশ্লেষণ নিশ্চয়ই আপনারা করবেন। এ-ও আপনাদের সুচিন্তিত বিবেচনার জন্য পেশ করছি, রেল থেকে বন্দর—সব যদি বিদেশি ও বেসরকারি খাতে পরিচালনার জন্য দিতে হয়, তাহলে এত বৃহৎ মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর খরচপাতি কেন বইবে দেশবাসী। শুরুতে ছোট মন্ত্রিসভার কথা শোনা গেলেও ইতিমধ্যে সেটা ৫০ অতিক্রম করেছে। আছেন আরও অনেক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী। নেপালে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেশে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ১৮-তে নামিয়ে ফেলেছিল। তাতে রাজস্ব খরচ কমার পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাড়তি গতি এসেছে। এসব বিষয়ে না হোক, গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার আইন কিংবা সম্ভাব্য সাইবার আইন নিয়ে কি আপনারা আরেকবার ভাববেন না? এসব আইন ক্ষমতার পালাবদল হলেও থাকবে! যেভাবে আপনাদের অতীত সরকারের তৈরি র‍্যাব পরের আমলে থেকেছিল এবং তার পার্শ্বফল আপনারা ভালোভাবে টের পেয়েছেন। আমরা জানি, বুদ্ধিমানেরা অতীত থেকে শেখে আর জ্ঞানীরা অন্যের ভুল থেকে শেখে। আমাদের পেছনে ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতা আছে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুতদের অতীতটুকুও আছে। আর রয়েছে শুভ ভবিষ্যতের ১৭ কোটি আশাবাদ। এ রকম সবকিছু সঁপে দেওয়া আছে আপনাদের হাতে। শুভকামনা। আলতাফ পারভেজ: গবেষক ও লেখক মতামত লেখকের নিজস্ব

বিএনপির কর্মীরা বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন কি 

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ঘোচাতে হবে

আমাদের শিশুরা কতটা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে, তার একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান প্রকাশ পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ থেকে ২০২৬—এই ছয় বছরে দেশে ৩ হাজার ৪৮৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ২ হাজার ৫৯৮ শিশুকে এবং পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আঘাত নিয়ে চরম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছে ১১ হাজার ৪৫৮ শিশু। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার কেউই শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, এর চেয়ে বড় অশনিসংকেত আর কী হতে পারে?  এইচআরএসএসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ছয় বছরে দেশে ঘটে যাওয়া মোট ৬ হাজার ১৫৩টি ধর্ষণের ঘটনার অর্ধেকের বেশি শিকার হয়েছে নিষ্পাপ শিশুরা। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্ষণের পর ১৩১ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ১ হাজার ২৫৫টি শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটি একটি করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবনের গল্প, একটি করে পরিবারের আজীবনের কান্না। আমাদের সংবিধানে এবং দেশে বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শিশুদের সুরক্ষায় নানা কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অপরাধীরা প্রায়ই আইনি ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক প্রভাব বা সামাজিক নীরবতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত শিশু নির্যাতনকারীদের দিনের পর দিন আরও বেপরোয়া করে তুলছে। শিশুদের ওপর এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা বন্ধে এখনই রাষ্ট্র ও সমাজকে কঠোর ও দৃশ্যমান ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তপ্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের অবহেলা বা আপসকামিতা বন্ধ করে যথাযথ চার্জশিট দাখিল নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পাড়া–মহল্লা পর্যায়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সচেতনতামূলক জোরদার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার যাতে কোনো ধরনের হুমকি বা চাপের মুখে না পড়ে, তার আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একটি দেশ কতটা সভ্য বা উন্নত, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারছে। আমরা যদি আমাদের শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ একটি সমাজ দিতে না পারি, তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়বে।  বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ গড়ে তোলা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় তাগিদ।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ঘোচাতে হবে

ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০: দায় কার—মশা নাকি ?সুশাসনের

উন্মাদনা হলো একই জিনিস বারবার করে ভিন্ন ফলাফলের প্রত্যাশা করা, কথাটি আলবার্ট আইনস্টাইনের। বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার সরকারি কার্যক্রম দেখলে মনে হয়, আমরা বছরের পর বছর সেই উন্মাদনারই চর্চা করে যাচ্ছি। আজকের প্রথম আলোর প্রতিবেদন হচ্ছে, এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের মেঝে ও সিঁড়িতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিসংখ্যান ও ঘোষণা নিছক তথ্য নয়, একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দলিল। ​বিগত সবগুলো সরকারের সময় আমরা ডেঙ্গুর কাছে তাদের অসহায়ত্ব দেখেছি। এখন সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, সিটি করপোরেশনের নেতৃত্ব বদলেছে, তবু ফলাফল বদলায়নি। প্রশ্ন হলো, এই ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে আমরা আর কত দিন কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা বলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখব? একজন আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি, সময় এসেছে বিষয়টিকে সাংবিধানিক ও আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করার। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে এবং আমাদের সর্বোচ্চ আদালত বহু রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে এই অধিকার কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকার। ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের মান উন্নয়নকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই দুই অনুচ্ছেদ একত্রে পড়লে দাঁড়ায়, প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে বছরের পর বছর শত শত নাগরিকের মৃত্যু ঘটতে দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ​আসল প্রশ্নটা মশা নয়, বড় প্রশ্নটা আসলে সুশাসনের। মশা তো সিঙ্গাপুরে আছে, ইন্দোনেশিয়ায় আছে, পৃথিবীর বহু উষ্ণ দেশে এডিস মশা আছে। তারা বিজ্ঞান, নজরদারি, উৎসেই মশা নিধন এবং জবাবদিহির মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হচ্ছে। একজন কীটতত্ত্ববিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে থাকলে গত বছর ৬২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হতেন না, এ বছরও মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে। অর্থাৎ রোগ নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে তা হয়নি। সরকারি জরিপেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, মশার প্রজননস্থল হিসেবে সিমেন্টের পানির ট্যাংক ও জলমগ্ন মেঝেকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সমস্যার মানচিত্র হাতে থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া নিছক অবহেলা নয়, দায়িত্বে চরম ঔদাসীন্য, যা আইনের চোখে জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত। ​প্রতিবছর মশা নিধনে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে, কীটনাশক কেনা হয়, ফগিং হয়, ধোঁয়ায় রাস্তা অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু কত শতাংশ মশা কমল, ওয়ার্ডভিত্তিক মশার মানচিত্র কোথায়, কীটনাশকের কার্যকারিতা ও প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষার ফল কোথায়, স্বাধীন নিরীক্ষা কোথায়—এসব প্রশ্নের জবাব নেই। এই স্বচ্ছতার অভাব একা প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অনিয়মের প্রমাণও মেলে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দরপত্র ছাড়াই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ টাকার ওষুধ কেনার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সরকার বদলের পরও ছবিটা বদলায়নি, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম সিটিতে মশার ওষুধ কেনা হয়েছে একজন উপদেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় একটি কীটনাশক নিষিদ্ধ করলেও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একই ওষুধ ব্যবহার চালিয়ে গেছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কীটনাশক ভান্ডারে অভিযান চালিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ পেয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, জনস্বাস্থ্যের নামে বরাদ্দকৃত অর্থে অনিয়ম কোনো একটি সরকার বা দলের একচেটিয়া সমস্যা নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি, যা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় না। ​জনস্বাস্থ্যে দুর্নীতি অন্য যেকোনো দুর্নীতির চেয়ে ভয়ংকর। রাস্তার কাজে দুর্নীতি হলে রাস্তা ভাঙে; মশা মারার কাজে দুর্নীতি হলে মানুষ মরে। ফৌজদারি আইনের দৃষ্টিতে, সরকারি অর্থ ব্যয় করে নিম্নমানের বা অপরীক্ষিত কীটনাশক কেনা এবং তা জেনেবুঝে ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া, বিশেষত যখন তার ফলে প্রাণহানি ঘটে, তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধের সীমায় পড়তে পারে। ​দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী এসব ঘটনার তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলকভাবে, কেবল প্রতিবেদন প্রকাশ ও সাময়িক তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে। আমাদের উচ্চ আদালত ইতিমধ্যে দেখিয়েছেন যে মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বিচারযোগ্য বিষয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য হাইকোর্ট ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে ভর্ৎসনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ধরনের হস্তক্ষেপ এখনো বিচ্ছিন্ন ও সুনির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক থেকে যাচ্ছে, অথচ সংকট জাতীয়। এখন প্রয়োজন ব্যাপক আকারে জনস্বার্থে মামলা দায়েরের মাধ্যমে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বিরুদ্ধে একটি সামগ্রিক নির্দেশনা আদায় করা, যেখানে আদালত সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেবেন, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেবেন, এবং ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেবেন। পরিবেশদূষণ বা সড়ক নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়ে অতীতে যেমন আদালত থেকে ব্যাপক নির্দেশনা এসেছে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও তেমন একটি জাতীয় বিচারিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে। মেয়র, সচিব ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাধিক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডকে উপ–অঞ্চলে ভাগ করে সমন্বিত কার্যক্রম চালানো হবে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসনিক আইনের একটি মৌলিক নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক, ক্ষমতা যেখানে অর্পিত, দায়ও সেখানে বর্তায়। সিটি করপোরেশন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচিত প্রশাসনিক জবাবদিহি তলব করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া। ​ তুলনামূলক আলোচনায় প্রায়ই আসে কলকাতার উদাহরণ, যারা ফগার মেশিন দিয়ে সাময়িক মশা তাড়ানোর বদলে বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগেই নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত আট মাস উৎসেই মশা নিধনে ধারাবাহিক কাজ চালিয়ে সফল হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি, প্রাক–মৌসুম পরিকল্পনাকে বাংলাদেশেও আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা সম্ভব, সিটি করপোরেশন আইনে বার্ষিক মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা দাখিল ও অনুমোদন বাধ্যতামূলক করে, অবাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রেখে। ​সমাধান হিসেবে প্রথমত, ডেঙ্গুকে মৌসুমি সমস্যা না ভেবে স্থায়ী জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে সারা বছরের বাজেট, জনবল ও জবাবদিহির কাঠামো নির্ধারিত থাকে। দ্বিতীয়ত, সংক্রামক রোগ আইন ও স্থানীয় সরকার আইনে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক যুক্ত করতে হবে, যাতে ব্যর্থতা প্রমাণসাপেক্ষ ও শাস্তিযোগ্য হয়। তৃতীয়ত, কীটনাশক ক্রয় প্রক্রিয়ায় বাধ্যতামূলক স্বাধীন পরীক্ষা ও প্রকাশ্য নিরীক্ষার বিধান রাখতে হবে, যাতে নিষিদ্ধ বা অপরীক্ষিত ওষুধ কেনার সুযোগ না থাকে। চতুর্থত, প্রমাণিত প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণে মৃত্যু ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ কাঠামো তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, আইনজীবী সমিতি ও সুশীল সমাজের উচিত সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে একটি জাতীয় নির্দেশনা আদায় করা। একটি মশা যদি সরকার বদলের পরও রাষ্ট্রকে বারবার পরাজিত করতে থাকে, তাহলে সমস্যাটা আর মশা নয়, সমস্যাটা আমাদের শাসনব্যবস্থায়। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই আসলে অদক্ষতা, অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি সুশাসনের জন্য লড়াই। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাঁর হাতে, জবাবদিহিও তাঁর। প্রতিটি ডেঙ্গু মৃত্যু কেবল একটি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান নয়, তা সাংবিধানিক অঙ্গীকার ভঙ্গের দৃষ্টান্ত। ​আইন আছে, বিচারিক নজিরও আছে, প্রয়োজন কেবল তার কঠোর ও ধারাবাহিক প্রয়োগ। আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান সরকার, প্রশ্নটা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, প্রশ্নটা রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহির সক্ষমতার। এবার সত্যিই সময় এসেছে আয়নাটা নিজেদের দিকে ফেরানোর, নইলে আগামী বছরও আমাদের হয়তো একই সংখ্যা, একই আর্তনাদ নিয়ে বসতে হবে। ওমর সাদাত নগর অধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০: দায় কার—মশা নাকি ?সুশাসনের

ঢাকার সঙ্গে দিল্লির ছবির এত মিল কেন

দশ মিনিট পর পর নতুন আপডেট। ঘটনার পর ঘটনা। আটকের পর আটক। শনিবার সকালে ধ্রুব রাঠিকে দিয়ে শুরু। এরপর পর অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কার। এরপর নেহা বোরা। সন্ধ্যা নাগাদ ককরোচ আন্দোলনের বহু নেতা আটক হয়েছেন। আটক হয়েছেন তৃণমূলে কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আটক হয়েছেন আম আদমির কেজরিওয়াল। আটক হয়েছেন সাত হাজারের কাছাকাছি ‘ককরোচ’। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নেহা বোরাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের যন্তর-মন্তরে যাওয়ার কথা ছিল। ১৩ কোটির বেশি নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বেআইনিভাবে বাদ দেওয়া সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে গারদে পোরার দাবি তুলে তাঁরাই এখন মোদির গারদে। ‘দিল্লি এখন দুর্গ, আর সারা দেশ এক কয়েদখানা’—রাহুল গান্ধীর এই কথার মধ্যে রাজনৈতিক চটকদারি আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দিল্লি এখন আক্ষরিক অর্থেই অবরুদ্ধ। সাধারণ লোকজন দিল্লিতে ঢুকতে বা বের হতে পারছেন না। মেইল ট্রেন বন্ধ। মেট্রো রেল বন্ধ। বাস বন্ধ। ধরপাকড় চলছে। ১৬৩ ধারা জারি রয়েছে। বিশাল এলাকা জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ। মোদি সরকার এমন মারমুখী কেন?—সরকারের দিক থেকে এর কোনো জবাব নেই। যাঁরা আন্দোলনের সঙ্গে, তারা দেশদ্রোহী—এই কথা বলছেন মোদি সরকার ও বিজেপি সমর্থকেরা। এরপরও জেনজি থামছে না। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন অভিভাবকেরা। সেলিব্রেটি ও বুদ্ধিজীবীরাও রাস্তায় নামছেন। ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়!’ স্লোগান উঠছে। দেয়ালে দেয়ালে কালির স্প্রে দিয়ে কম বয়সী ছেলেমেয়েরা স্লোগান লিখছে। গ্রাফিতি আঁকছে। এই দৃশ্যপটে ইতিহাস-পুনরাবৃত্তির অনিবার্য দর্শন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে যা যা ঘটেছে, সেই ছবিগুলোই যেন কোনো অদৃশ্য বায়োস্কোপওয়ালা একটার পর একটা ভারতের প্রেক্ষাগৃহে দেখিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকায় আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটা নিয়ে। আর ভারতে শুরু হয় মেডিকেলের প্রশ্নপত্র বা নিট পেপার ফাঁস নিয়ে। ছেলে মেয়েরা প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ করতেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ভরা আদালতে আন্দোলনকারীদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলে বসেছিলেন। এই গালিকেই প্রতিবাদের পরিচয় হিসেবে নিয়ে তরুণেরা নিজেদের ‘তেলাপোকা’ ঘোষণা করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) খুলে রাস্তায় নামল। ঠিক যেভাবে বাংলাদেশে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখে ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা চাকরি পাবে না তো কি রাজাকারের বাচ্চারা পাবে’ উচ্চারিত হওয়ার পর ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানে অপমানের ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল তরুণেরা, একইভাবে ভারতের জেনজিরা এখন নিজেদের বলছেন, ‘ককরোচ’। বিক্ষোভের মুখে মোদির অতি ঘনিষ্ঠ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দেওয়ার পর তেলাপোকারা তাৎক্ষণিকভাবে যার যার ডেরায় ফিরলেও তাদের ‘উৎপাত’ একদম শেষ হয়ে গেছে, এমনটা সম্ভবত মোদি সরকারের কেউ ভাবেননি। আবার এত শিগগিরই যে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের জালিয়াতির খবর আলোয় আসবে এবং তার পরপরই সদ্য আস্তানায় ফেরা তেলাপোকারা শুঁড় উঁচিয়ে দলে দলে রাস্তায় নামবে—এটিও কেউ আঁচ করতে পারেনি। ককরোচের হাত থেকে দিল্লিকে ‘রক্ষা’ করতে সরকার যখন দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গিয়ে বেকার তরুণদের ককরোচ বলে গালি দেওয়া সেই প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ শুক্রবার সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।’ এখানেও আন্দোলনকারীদের ‘মাছি’ বলে প্রকারান্তরে তাদের উদযোগকে অতি তুচ্ছ বলে ‘রায়’ দেওয়া হয়েছে। দিন শেষে এগুলো রাজনৈতিক ভাষা। রাজনৈতিক ভাষা যে কখনো কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপথ বদলে দিতে পারে, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এবং ভারতের আজকের পরিস্থিতি তার বড় উদাহরণ। আসলে কোনো এক রহস্যময় কারণে ক্ষমতার আসনে বসা মানুষ প্রায়শই ভুলে যান, শব্দেরও রাজনৈতিক জীবন রয়েছে। তাঁরা ভুলে যান, একটি শব্দ উচ্চারণের মুহূর্তে শেষ হয়ে যায় না। তা মানুষের স্মৃতিতে ঢুকে পড়ে, ক্ষোভের সঙ্গে মিশে যায় এবং কখনো কখনো তা প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মতোই ভারতের ক্ষেত্রে এই সত্যটি এখন হাজির হয়েছে। তবে এই আন্দোলনগুলো নেহাত ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়, এটি মূলত মানুষের অস্তিত্বের মর্যাদা রক্ষার চিরন্তন সংগ্রাম। রাষ্ট্র যখন মানুষের মৌলিক সত্তাকে অস্বীকার করে, আইনের মুখোশ পরে নাগরিকের স্বাধীন ইচ্ছাকে শেকলে বাঁধতে চায়, তখন সমাজের গভীরে এক অমোঘ স্ফুলিঙ্গ জমা হতে থাকে। তখন স্বৈরাচারী শাসন যতই বুলেট, কারফিউ আর ইন্টারনেটের ব্লকেড দিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চাক না কেন, গণমানুষের জলোচ্ছ্বাসের সামনে কৃত্রিম দুর্গগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে। বাংলাদেশে আন্দোলন যখন বাড়ছিল, তখন সে সময়কার সরকারি শিবির থেকে পুরো আন্দোলনকে বাইরের দেশগুলোর কারসাজি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। একইভাবে মোদি সরকারের দিক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা না হলেও বিজেপির নেতারা মূল সমস্যা, অর্থাৎ জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির কথা বেমালুম চেপে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ইলন মাস্কের ফান্ডিং ও পশ্চিমা ডিপ স্টেটের সহায়তা দেওয়ার কথা সামনে আনছেন। দিল্লিতে কী ঘটছে, তা বোঝার জন্য শুধু ধরপাকড় ও আটক মানুষের সংখ্যা গুনলে চলবে না। দেখতে হবে, কেন মানুষ রাস্তায় নামতে চাইছে, তাদের অভিযোগের উত্তর কীভাবে দেওয়া হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া মানুষের মনে কী ধরনের ধারণা তৈরি করছে। কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার পুলিশ, প্রশাসন কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের শক্তির আরেকটি ভিত্তি হলো নাগরিকের আস্থা। সেই আস্থা একবার ক্ষয়ে যেতে শুরু করলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ধেয়ে আসে। তখন ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের রাস্তা বন্ধ করা যায়, কিন্তু তাঁদের মনে জমে থাকা প্রশ্নকে একইভাবে আটকে রাখা যায় না। এই জায়গাতেই বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের বর্তমান প্রতিবাদের তুলনা জরুরি হয়ে ওঠে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, দুটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, আন্দোলনের তাৎক্ষণিক দাবিও আলাদা। কিন্তু দুটি ঘটনার মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে। সেটি হলো: তরুণদের অসন্তোষ একটি নির্দিষ্ট দাবি দিয়ে শুরু হলেও রাষ্ট্রের রিঅ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া সেই অসন্তোষকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপান্তরিত করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আন্দোলন যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে, বিষয়টি শুধু কোটা নিয়ে ছিল না। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া আন্দোলনের চরিত্রকেই এক সময় বদলে দিয়েছে। যে প্রশ্নটি প্রথমে ছিল কোটার, সেটিই এক সময় ইনসাফ, নাগরিক মর্যাদা এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তবে দিল্লির প্রতিবাদ দেশব্যাপী সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হবে কি না, তা এখনই বলা যাবে না। কারণ সেখানে নিরাপত্তাকর্মীরা দৃশ্যত পেশাদারি কায়দায় আন্দোলনকারীদের সামাল দিচ্ছেন। বাংলাদেশের মতো সেখানে এখন পর্যন্ত হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে শুনিনি। তবে এত বড় দেশে এত জায়গায় একসঙ্গে চলা আন্দোলন যে কোনো সময় সহিংস রূপ নিতে পারে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছি না। ২. শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের রাজনৈতিক সংকট আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো সরকারই সামাজিক ক্ষোভ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। তবে এই দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হুবহু এক ছিল না। সব ক্ষেত্রেই সরকার পতন একই ধরনের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঘটেনি। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, সামাজিক আন্দোলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা—একেক দেশে একেক মাত্রায় কাজ করেছে। এ কারণে শুধু কয়েকটি দৃশ্যের মিল দেখে সব দেশের জন্য একই পরিণতি ধরে নিলে তা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে দেখার নামান্তর হবে। তবু ইতিহাসের পাঠ বলছে, ক্ষমতা যখন নিজের সমালোচনাকে বিপদ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথম পথ হলো প্রশ্ন উঠলে তার জবাব দেওয়া, অভিযোগ তদন্ত করা, প্রয়োজনীয় সংস্কার করা এবং মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা। দ্বিতীয় পথ হলো প্রশ্নকারীদের মুখ চেপে ধরা, সমাবেশ সীমিত করা এবং বিরোধিতাকে নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা। এই দ্বিতীয় পথটি কখনো তাৎক্ষণিকভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে, কিন্তু অভিযোগের মূল কারণ যদি না মেটানো হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংকট থেকেই যায়। যে সরকার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, সে প্রশ্নকে ভয় পায় না। যে প্রতিষ্ঠান নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে পারে, তাকে সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে হয় না। আর যে রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকারকে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি বলে স্বীকার করে, সে রাষ্ট্র জানে যে প্রতিবাদ সব সময় শত্রুতা নয়; অনেক সময় প্রতিবাদই রাষ্ট্রকে তার ভুল দেখিয়ে দেয়। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের মাটিতে মোদি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি। এটি তাঁর পলায়নপর মনোভাবের প্রকাশ নাকি নিজেকে উঁচু দেয়ালে ঘিরে রাখা এক অজেয় মহামানব হিসেবে প্রদর্শন করার চেষ্টা, সে প্রশ্নের মীমাংসা এখনো হয়নি। চলমান আন্দোলন হয়তো শিগগিরই সেই প্রশ্নের জবাব সামনে হাজির করবে।

ঢাকার সঙ্গে দিল্লির ছবির এত মিল কেন

দিল্লিতে বিক্ষোভ: ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে ভোটাধিকার নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সেখানে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে জেন-জির সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তাদের সমর্থন জানাতে শনিবার সকালে দিল্লিতে বিক্ষোভের জন্য জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের অনেককে আটক করেছে পুলিশ। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে তারা এই তালিকা বাতিল ও ব্যাপক নির্বাচনী সংস্কারের দাবি তুলছেন। আপাতত মধ্য নয়াদিল্লির বিভিন্ন এলাকা থমথমে হয়ে আছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার পুরো শহরকে এক প্রকার দুর্গে পরিণত করেছে; নামানো হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী। ইতিমধ্যে ককরোচ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আটক হয়েছেন পুলিশের হাতে। শনিবার ভোরে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর খবরে বলা হয়, মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণের পরই দীপকের সঙ্গে দেখা করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এক বিবৃতিতে সিজেপি জানিয়েছে, দলের অপর দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকেও বিমান অবতরণের পরপরই আটক করা হয়েছে। এর আগে শুক্রবার মোদি সরকার অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়ে নয়াদিল্লিগামী সব ট্রেন বাতিল করে, ৫০টিরও বেশি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয় এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। এমনকি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ না দিতে সতর্ক করা হয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে নয়াদিল্লিগামী বাস ও ট্রেন থেকে বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে আটক করা হয়েছে। নয়াদিল্লি থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের শহরগুলোতে অনেককে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। মোদি সরকারের দমনপীড়ন তীব্র হওয়ার মুখে দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ককরোচ আন্দোলন। তবে এতে দমে না গিয়ে বিক্ষোভকারীরা বারবার রাজপথে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছেরাজধানী দিল্লির বর্তমান কড়াকড়ি ও দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়ন ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করেছিলেন, সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিলেন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাগারে পাঠিয়েছিলেন।এক্স (সাবেক টুইটার)-এ এক পোস্টে ককরোচ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা দীপকে লেখেন, ‘নরেন্দ্র মোদি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থা চালু করলেন। মোদি, এই ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না। এ দেশের তরুণ সমাজ আপনাকে আর ভয় পায় না।’ বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভানেত্রী ও জেন-জি আন্দোলনের অগ্নিঝরা নেত্রী নেহা বোরা মোদি সরকারকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি সাধারণ জনগণকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। শনিবার সকালে পুলিশের বিধিনিষেধ সত্ত্বেও যুবসমাজ তাঁর ডাকে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কনাট প্লেসের আউটার সার্কেলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সন্তোষ কুমার (২৯) আল জাজিরাকে জানান, ব্যারিকেডের সামনে তরুণদের আটক হতে দেখে তিনি হতাশ বোধ করছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি কীভাবে এই বাচ্চাদের আটকাবেন? ১০ জনকে আটক করলে আরও ৫০ জন আসছে। স্বৈরাচারী মোদির সময় শেষ; তিনি ২০২৯ সাল পর্যন্তও টিকবেন না।’ নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এখন সময় দিল্লিকে নেপাল ও বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলা—তাদের কাছ থেকে শিখে আমাদের দেশ পুনর্নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।’ গুরুগ্রাম থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী সমীর এরশাদ তাঁর ৫৭ বছর বয়সী মা শিবা আবদিকে হুইলচেয়ারে ঠেলে কনাট প্লেসের ব্যারিকেডের দিকে এগিয়ে যান।শিবা আবদি বলেন, ‘এ রকম দমনপীড়ন, যেখানে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদও জানাতে পারি না, তা দিল্লিতে আগে কখনো দেখা যায়নি। সরকার কেন এই জায়গাটাকে দুর্গে পরিণত করল? আমার মতো সাধারণ নাগরিককে তারা এতটা ভয় পাচ্ছে কেন?’ গৃহবন্দী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা স্বাধীন সংস্থাটির ভেতরের বিভাজনের খবর গত মাসে পুরো ভারতকে নাড়া দেয়। সমালোচকদের মতে, বিতর্কিত কিছু নীতির কারণে কোটি কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিয়ে অন্য দুই কমিশনারের তোলা আপত্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন। ভারত বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের একটি, যারা প্রতিটি নাগরিককে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্রিয় উদ্যোগ নেয়। তবে সমালোচকদের মতে, চলমান ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটি ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই বদলে দিচ্ছে—এখানে নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রমাণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং মুসলিম, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণি, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। প্রতিবাদে যোগ দেওয়া আরেকটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সাহারানপুর জেলা সমন্বয়ক আরিফকে (২৪) গত বৃহস্পতিবার থেকে নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ১২৫ মাইল দূরের নিজ বাড়িতে বন্দী করে রাখা হয়েছে।নিরাপত্তার স্বার্থে পূর্ণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরিফ আল জাজিরাকে বলেন, ‘রাতের গভীরে হঠাৎ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে আমার দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করেন এবং বাবা-মায়ের কাছে আমার অবস্থান জানতে চান।’ তিনি জানান, সাহারানপুরের বাড়িতে পুলিশ ২৪ ঘণ্টা কড়া নজরদারিতে রেখেছে। ‘তারা শুধু আমাকে প্রতিবাদে অংশ নিতে দিল্লি যাওয়া থেকে আটকাতে চায়। তারা আমাকে ফৌজদারি মামলায় ফাঁসানো ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করার হুমকি দিচ্ছে।’প্রথমবারের মতো গৃহবন্দী হওয়া আরিফ বলেন, ‘আমি সত্যিই দিল্লিতে গিয়ে আমাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে যোগ দিতে চেয়েছিলাম। মোদির সময় শেষ হয়ে এসেছে।’ ‘সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে’ মোদিচলতি সপ্তাহে মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় থাকার ২৫ বছর উদ্‌যাপন করেছে। ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বিতর্কিত ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর এই যাত্রার শুরু, আর ২০১৪ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিকে কখনোই এখনকার মতো এতটা দুর্বল দেখায়নি। গত জুলাইয়ে ককরোচ আন্দোলনের কারণে নয়াদিল্লির প্রধান রাস্তাগুলো অচল হয়ে পড়েছিল এবং বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছিল মোদির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে।মোদির জীবনীকার ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় আল জাজিরাকে বলেন, ‘মোদি এমন এক নেতার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চান যিনি জনদাবিতে কখনো নতিস্বীকার করেন না এবং যিনি অপরাজিত। তাই এবার তিনি আন্দোলনকারীদের মধ্য দিল্লিতে জমায়েত হওয়া ঠেকাতে চরম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের দৃষ্টিতে মোদি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নিম্নে অবস্থান করছেন। তবে এর মধ্যে বৈপরীত্য আছে। কারণ দেশের প্রধান স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্রের বড় অংশ ও সরকারি সংস্থাগুলো এখনও তাঁর শক্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ তিনি জানান, অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে মোদি যে সাধারণ মানুষকে সংকট থেকে বের করে আনার নেতা—সেই ভাবমূর্তি দ্রুত হারাচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, ‘মোদি সরকার জনগণকে দেখে বেশ ভীত বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ভারতের মানুষ এখন জেগে উঠছে এবং জবাবদিহি চাইছে। সরকার যখন ভয় পায়, তখন ক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা নির্মম পথ বেছে নেয়। কিন্তু এই দমনপীড়নের মধ্য থেকেই আরও বেশি মানুষ রাজপথে নেমে আসবে।’ যশরাজ শর্মা দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক ও আলজাজিরার প্রতিবেদক আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

দিল্লিতে বিক্ষোভ: ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে
Radio Logo
নগদ বার্তা Live
Live Audio Stream