প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬
এক মায়ের দৌড়, এক শিশুর নিভে যাওয়া
জাহিন ফয়সাল , প্রকাশক ||
ঢাকার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন শাহানা বেগম। কোলে কখনো খাদিজা, কখনো ফাতেমা—সাত মাস বয়সী যমজ দুই মেয়েকে বাঁচিয়ে ঘরে ফেরানোর লড়াইয়ে দিন-রাত এক করে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই থেমেছে এক শিশুর মৃত্যুতে।হাম-পরবর্তী জটিলতায় গত ২৩ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ছোট্ট ফাতেমা। যমজ বোন খাদিজা এখনো অসুস্থ। জ্বর, কাশি আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাকে ঘিরেও কাটছে না মায়ের দুশ্চিন্তা।শাহানা বেগম বলছিলেন, ফাতেমার মৃত্যু তিনি এখনো মানতে পারেন না। হাসপাতালের বিছানাতেও মেয়েটি হাসছিল, খেলনা নিয়ে খেলছিল। তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার বিশ্বাস ছিল—দুই মেয়েকেই সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে ফিরবেন।এপ্রিলের শুরুতে জ্বর, ঠান্ডা ও কাশিতে একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ে খাদিজা ও ফাতেমা। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা শুরু হলেও অবস্থার অবনতি হলে তাদের নিয়ে ঢাকায় আসেন পরিবার। এরপর শুরু হয় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটাছুটি। কোথাও শয্যা নেই, কোথাও অক্সিজেন সংকট, কোথাও আবার শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র খালি নেই—এভাবেই সময় পেরিয়েছে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায়।এক পর্যায়ে এক মেয়েকে ভর্তি নিলেও আরেকজনকে নিতে অনীহা দেখান চিকিৎসকেরা। অনেক অনুরোধে দুজনকে ভর্তি করা হলেও কিছু সময় পর একজনকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। তখন পরিবারের সামনে নতুন সংকট—এক শিশু হাসপাতালে, আরেক শিশু বাসায়। দুজনকে একসঙ্গে সামলাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে।পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন বড় মেয়ে আয়েশাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। একসময় পরিবারের তিন সন্তান তিন জায়গায় চিকিৎসাধীন ছিল। সন্ধ্যার পর হাসপাতালের ওয়ার্ডে পুরুষ স্বজনদের থাকতে না দেওয়ায় মা ও নানিকেই একা সামলাতে হয়েছে পুরো পরিস্থিতি।শাহানা অভিযোগ করেন, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতালে আচরণগত দুর্ভোগও পোহাতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে চাইলে অনেক সময় ধমক শুনতে হয়েছে, সমন্বয়হীনতায় ভোগান্তিও বেড়েছে।চিকিৎসার খরচও ছিল পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা। ফাতেমার চিকিৎসাতেই ব্যয় হয়েছে এক লাখ টাকার বেশি। পিআইসিইউর দৈনিক ব্যয়, ওষুধ ও পরীক্ষা মিলিয়ে খরচ সামলাতে গিয়ে গহনা বিক্রি করতে হয়েছে পরিবারকে। এরপরও ধার-দেনা করতে হয়েছে চিকিৎসা চালাতে।সব চেষ্টা, সব দৌড়ঝাঁপের পরও ফাতেমাকে আর ফিরিয়ে আনা যায়নি। এক মাসের যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরেছে পরিবার, কিন্তু কোলে নেই আগের সেই হাসিখুশি শিশু।
এখন শাহানার সব ভয় খাদিজাকে ঘিরে। যমজ বোনকে হারিয়ে ফেরা শিশুটিও এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। তাই এক মেয়েকে হারানো এই মায়ের কাছে প্রতিটি নতুন জ্বর, প্রতিটি কাশি যেন নতুন আতঙ্কের নাম।
সম্পাদক :মোহাম্মদ মঞ্জুরুল কবির (মঞ্জু) ll প্রকাশক: জাহিন ফয়সাল (শুভ)
২০২৬ © নগদ বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত