প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ব্যয়, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ
মো বিজয় , জেলা প্রতিনিধি ||
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেশের সবচেয়ে বড় ও কৌশলগত বিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে মোট অর্থের প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া, যা বাংলাদেশকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২৮ বছরে পরিশোধ করতে হবে।প্রকল্পের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী রূপপুর থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সম্ভাব্য ব্যয় ছয় টাকার কাছাকাছি ধরা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এখন বলছে, বাস্তব ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১২ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ফলে উৎপাদন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। রূপপুরে ব্যবহৃত তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তিতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা জরুরি পরিস্থিতিতে মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। তাদের দাবি, নিরাপত্তা কাঠামো, প্রযুক্তিগত মান এবং আন্তর্জাতিক তদারকি—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর একটি।রূপপুর প্রকল্পে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামভিত্তিক। এই জ্বালানি প্রস্তুতের জন্য প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড থেকে ছোট আকারের প্যালেট তৈরি করা হয়। পরে এসব প্যালেট দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি করা হয় জ্বালানি রড। একাধিক রড নির্দিষ্ট বিন্যাসে একত্রিত করে তৈরি হয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি বা জ্বালানি বান্ডেল, যা রি-অ্যাক্টরের মূল অংশে ব্যবহার করা হয়।২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান বাংলাদেশে পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি চালান দেশে আসে। বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এসব জ্বালানি রূপপুরে সংরক্ষণ করা হয়। প্রকল্প সূত্র জানায়, অতিরিক্ত একটি সংরক্ষণ ইউনিটসহ মোট ১৬৪টি জ্বালানি বান্ডেল দেশে আনা হয়েছে। প্রতিটি বান্ডেলে রয়েছে ৩১২টি জ্বালানি রড। প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডেল ব্যবহার করা হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, রি-অ্যাক্টরে জ্বালানি স্থাপন বা ‘ফুয়েল লোডিং’ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ধাপ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে প্রায় ৩০ দিন ধরে রি-অ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি বসানো হবে। এরপর শুরু হবে ‘ফিজিক্যাল স্টার্টআপ’, যেখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া চালু করে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। এ ধাপে সময় লাগতে পারে প্রায় এক মাসের বেশি।পরীক্ষামূলক ধাপ শেষে রি-অ্যাক্টরের উৎপাদনক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। শুরুতে ৩ শতাংশ ক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করে পর্যায়ক্রমে ৫, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, রি-অ্যাক্টর ৩ শতাংশ ক্ষমতায় পৌঁছালেই জাতীয় গ্রিডে প্রথমবার বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। এরপর নিরাপত্তা ও কর্মক্ষমতা যাচাইয়ের নানা ধাপ অতিক্রম করে পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগতে পারে।রূপপুরের প্রতিটি জ্বালানি লোড সাধারণত ১৮ মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। ব্যবহৃত জ্বালানিতে তেজস্ক্রিয় উপাদান থাকায় তা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) নজরদারিতে সম্পন্ন হবে। জ্বালানি ব্যবহারের প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নথিভুক্ত ও পর্যবেক্ষিত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।চুক্তি অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রথম তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। এই সময়ের মধ্যে জ্বালানি সংগ্রহ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো চাপ থাকবে না। পরবর্তীতে বাংলাদেশকে নিজ উদ্যোগে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক জ্বালানি ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না; সাধারণত দুই বছর পরপর জ্বালানি পরিবর্তন করলেই উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ অত্যন্ত কম হওয়ায় এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে অল্প জ্বালানিতে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকায় কয়লা ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমবে। এ কারণে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক জ্বালানি বাস্তবতায় পারমাণবিক শক্তিকে এখন অনেক দেশ পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে।সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুর প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন উৎস নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন অধ্যায় তৈরি করবে। তবে এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে ব্যয় ব্যবস্থাপনা, দক্ষ পরিচালনা, নিরাপত্তা রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি সরবরাহের টেকসই কৌশলের ওপর।
সম্পাদক :মোহাম্মদ মঞ্জুরুল কবির (মঞ্জু) ll প্রকাশক: জাহিন ফয়সাল (শুভ)
২০২৬ © নগদ বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত